ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে যে দেশটি আলোচনার আয়োজক হিসেবে সামনে এসেছে, সেটি অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত—পাকিস্তান। ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দেওয়া এই দেশটি আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় উঠে এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনা ইসলামাবাদে ফের শুরু হওয়ার কথা থাকায় পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক অবস্থান নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ট্রাম্পকে ঘিরে কৌশলী কূটনীতি
গত এক বছরে পাকিস্তান পরিকল্পিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালিয়েছে। বিভিন্ন চুক্তি, প্রকাশ্য প্রশংসা এবং কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। পাকিস্তানের সাবেক এক নীতিনির্ধারক জানান, ট্রাম্পের কূটনৈতিক ধরন বুঝে তারা ‘ক্রিপ্টো, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা’—এই তিনটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলে।
এই প্রচেষ্টার ফলেই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে পাকিস্তান অতীতে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলায় জড়িত একজনকে শনাক্ত করতেও সহায়তা করে। পাশাপাশি খনিজ সম্পদ ও ক্রিপ্টো ব্যবসা সংক্রান্ত একাধিক চুক্তিও হয়।

দুই পক্ষের আস্থা অর্জন
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আস্থা অর্জন করা। তারা মূলত দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থানও তাদের কূটনৈতিক মর্যাদা বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানি গণমাধ্যমে এই ভূমিকাকে ‘উজ্জ্বল কূটনীতি’ ও ‘অসাধারণ সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অনেকের মতে, এটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উদ্বেগ
তবে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই কূটনৈতিক সাফল্যের প্রভাব খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কাঠামোগত সমস্যাগুলো এখনো সমাধান হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যায় জনগণ চাপে রয়েছে।
ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানের জ্বালানি আমদানির বেশিরভাগই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। ওই পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারকে মজুত ব্যবহার করতে হয়েছে এবং জ্বালানির দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, যা জনমনে অসন্তোষ তৈরি করেছে।

নিরাপত্তা ও সামাজিক চাপ
দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নাজুক। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, এতে প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটে। এমনকি করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটে হামলার চেষ্টা হয়।
এদিকে শান্তি আলোচনার সময় শহরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে গিয়ে দোকানপাট বন্ধ রাখতে হয়, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে ভিন্ন ব্যাখ্যা
সমালোচকদের মতে, পাকিস্তানের এই আন্তর্জাতিক সক্রিয়তা আসলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ থেকে দৃষ্টি সরানোর কৌশল। তারা মনে করেন, নেতৃত্ব দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের বদলে বৈশ্বিক কূটনীতিকে সামনে আনছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও তা সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে না। বরং এটি সাময়িকভাবে বড় সমস্যাগুলো আড়াল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান বর্তমানে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। শান্তি আলোচনার এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















