চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ওপেন সোর্স বনাম ক্লোজড সিস্টেমের দ্বন্দ্ব। এই প্রেক্ষাপটে চীনা স্টার্টআপ মুনশট এআই তাদের সর্বশেষ ফ্ল্যাগশিপ ওপেন সোর্স মডেল ‘কিমি কে২.৬’ উন্মুক্ত করেছে। একই সময় আলিবাবা, বাইটড্যান্স ও টেনসেন্টের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ওপেন সোর্স ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে এক ধরনের ঐকমত্যে পৌঁছালেও, অনেকেই এখনও ক্লোজড সিস্টেমে বিনিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিযোগিতায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশল
চীনা এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্যবসায়িক কৌশলে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কোম্পানির বৃদ্ধি, পরিপক্বতা এবং বাজার অবস্থানের ওপর নির্ভর করে ওপেন সোর্সের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতিও ভিন্ন হচ্ছে। কেউ সম্পূর্ণ ওপেন সোর্সে ঝুঁকছে, আবার কেউ হাইব্রিড কৌশল—অর্থাৎ ওপেন ও ক্লোজড—দুই ধরনের মডেলই ব্যবহার করছে।

কিমি কে২.৬: কী নতুন
নতুন মডেল ‘কিমি কে২.৬’-এ দীর্ঘমেয়াদি কোডিং সক্ষমতা, গতিশীল ফ্রন্ট-এন্ড তৈরির দক্ষতা এবং এজেন্টভিত্তিক কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনা হয়েছে। মুনশট এআই দাবি করেছে, এই মডেলটি বিভিন্ন পরীক্ষায় কিছু শীর্ষ ক্লোজড মডেলের সমতুল্য বা তার চেয়েও ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই এখনও সীমিত, যা ওপেন ও ক্লোজড মডেলের তুলনায় মানদণ্ডের অভাবকে সামনে এনে দেয়।
একটি বিশ্লেষণ সংস্থার মূল্যায়নে ‘কিমি কে২.৬’ বিশ্বব্যাপী ওপেন সোর্স মডেলের শীর্ষ স্তরের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।
ক্লোজড মডেলের দিকেও ঝোঁক
অন্যদিকে, কিছু বড় চীনা প্রতিষ্ঠান ক্লোজড মডেলেও জোর দিচ্ছে। যেমন, আলিবাবা ক্লাউড তাদের নতুন মডেল ‘কিউয়েন৩.৬ ম্যাক্স’ শুধুমাত্র নিজেদের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করে উন্মুক্ত করেছে, যা সাধারণভাবে উন্মুক্ত নয়।
তবুও চীনের এআই খাত পুরোপুরি ওপেন সোর্স থেকে সরে আসেনি। বরং ওপেন সোর্স ব্যবস্থাই দেশটির প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকে আলাদা করেছে, যেখানে অধিকাংশ উন্নত মডেল গোপন রাখা হয়।

সরকারি সমর্থন ও নীতিগত দিক
চীনের ‘এআই প্লাস’ উদ্যোগে ওপেন সোর্সকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি ২৪টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা—যাদের মধ্যে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিও রয়েছে—একটি যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে ওপেন সোর্স ইকোসিস্টেমকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মুনশট এআইয়ের প্রধান নির্বাহী ইয়াং ঝিলিনের মতে, যদি মডেলের সক্ষমতা সমান পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে ওপেন সোর্সই শেষ পর্যন্ত ‘চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জন করতে পারে। তিনি এটিকে বৈশ্বিক এআই উন্নয়নে চীনের একটি অনন্য অবদান হিসেবে দেখছেন, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।

আইন ও বিনিয়োগে আস্থা বাড়ানোর প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আইনগত কাঠামো আরও শক্তিশালী হলে বিনিয়োগ ও গবেষণায় আস্থা বাড়বে। বিচার বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা এই খাতে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
তবে ওপেন সোর্স কৌশলের স্থায়িত্ব এখনও অনিশ্চিত। উন্নত এআই প্রযুক্তি থেকে আয় করার চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের সীমিত প্রবেশাধিকার চীনা কোম্পানিগুলোকে খরচ কমানোর দিকে আরও মনোযোগী করছে। ফলে এমন মডেল তৈরির চাপ বাড়ছে, যা কম কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করেও বড় পরিসরে কাজ করতে পারে।
মোটকথা, চীনের এআই খাত এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে ওপেন সোর্সের আদর্শ এবং ব্যবসায়িক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















