জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর আপাতদৃষ্টিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গেলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তির নয় বলে সতর্ক করেছে দেশটির আবহাওয়া সংস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কম্পনটি মূল ভূমিকম্প নাকি আরও বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস—তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
উচ্চমাত্রার ঝুঁকির সতর্কতা
ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাপানের আবহাওয়া সংস্থা একটি বিশেষ সতর্কতা জারি করে জানায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ৮ মাত্রা বা তার বেশি শক্তির ভূমিকম্প হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেড়েছে। যদিও সম্ভাবনা এখনো খুবই কম—প্রায় ১ শতাংশ—তবুও সাধারণ সময়ের তুলনায় এটি বেশি।
বিশেষ করে হোক্কাইডোর উপকূলের কাছে চিশিমা ট্রেঞ্চ এবং আরও দক্ষিণে জাপান ট্রেঞ্চ এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এটি নির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত মাত্র।

সুনামি আতঙ্ক, তবে বড় ক্ষতি এড়ানো গেছে
ভূমিকম্পের পর হোক্কাইডো, ইওয়াতে ও আওমোরি উপকূলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। প্রথমে তিন মিটার উচ্চতার ঢেউয়ের আশঙ্কা করা হলেও বাস্তবে সর্বোচ্চ ঢেউ ছিল মাত্র ৮০ সেন্টিমিটার, যা উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেনি। পরে সতর্কতা তুলে নেওয়া হলে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষ ঘরে ফিরতে পারেন।
তবে এই অঞ্চলগুলো এখনো ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির স্মৃতি বহন করছে, যেখানে ২২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছিল।
আফটারশক ও নতুন আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর একই এলাকায় অন্তত ১০টি আফটারশক হয়েছে, যার মাত্রা ছিল ৪.৪ থেকে ৫.৪। এগুলো সমুদ্রের নিচে হওয়ায় স্থলভাগে তেমন প্রভাব পড়েনি, তবে এগুলোই ভবিষ্যৎ ঝুঁকির ইঙ্গিত হতে পারে।
২০১১ সালের ভূমিকম্পের আগে একইভাবে একাধিক ছোট কম্পন হয়েছিল, যার মধ্যে বড় ভূমিকম্পের দুই দিন আগে ৭.২ মাত্রার একটি কম্পনও ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এখনকার পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের সীমাবদ্ধতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনো বিজ্ঞান এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে কোনো ভূমিকম্প বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস কিনা। তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক জানান, ভূমিকম্পের প্রকৃতি বোঝা এবং তা থেকে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নির্ধারণ করা অত্যন্ত জটিল।
তিনি বলেন, সামান্য ঝুঁকি বাড়লেও তা নিশ্চিত বিপদের ইঙ্গিত নয়, তবে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
সরকারের প্রস্তুতি ও নাগরিকদের করণীয়
জাপান সরকার জনগণকে সতর্ক থাকতে এবং জরুরি প্রস্তুতি জোরদার করতে বলেছে। বিশেষ করে শুকনো খাবার, পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী, টর্চলাইট ও ব্যাটারি মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হলে যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য যানবাহনে পর্যাপ্ত জ্বালানি রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একজন গবেষক জানান, এসব ছোট প্রস্তুতিই বড় দুর্যোগে জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্ভাব্য বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস
এই ভূমিকম্পের একদিন আগেই এক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছিলেন, যদি টোকিওর নিচে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়, তাহলে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে গৃহহীন হয়ে পড়তে পারে।
সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এই আশঙ্কা তুলে ধরে তিনি আগাম প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জাপান আপাতত বড় ক্ষতি এড়াতে সক্ষম হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত বিপদ এখনো কাটেনি। তাই সতর্কতা ও প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















