চীনে ই-কমার্স ও খাদ্য সরবরাহ খাতে বড় ধরনের অভিযানের পেছনে উঠে এসেছে এক অন্ধকার বাস্তবতা—গোপন কার্যালয়, তথ্য লুকানোর চেষ্টা এবং সরাসরি সহিংস প্রতিরোধ। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো শুধু অনিয়মই নয়, বরং সংঘর্ষের মুখেও পড়েছে।
রেকর্ড জরিমানা ও বড় প্ল্যাটফর্মের জড়িত থাকা
চীনের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাতটি বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে মোট ৩.৬ বিলিয়ন ইউয়ান জরিমানা করেছে। তদন্তে দেখা যায়, হাজার হাজার অবৈধ বেকারি এসব প্ল্যাটফর্মে কার্যক্রম চালাচ্ছিল। এর মধ্যে একটি প্ল্যাটফর্মকে এককভাবে ১.৫১ বিলিয়ন ইউয়ান জরিমানা করা হয় এবং নতুন বেকারি যুক্ত করার ওপর নয় মাসের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
গোপন অফিস ও সহিংসতার ঘটনা
ডিসেম্বরে পরিচালিত এক অভিযানে তদন্তকারীরা গভীর রাত পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে একটি গোপন অফিসের সন্ধান পান। সেখানে ঢোকার সময় এক কর্মকর্তার হাত দরজার চাপে ভেঙে যায় বলে জানা গেছে। পরদিন আবার তদন্তস্থলে হামলার ঘটনা ঘটে, যেখানে কর্মকর্তাদের ধাক্কাধাক্কি করে ফেলে দেওয়া হয় এবং আহত কর্মকর্তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

তথ্য লুকানোর মরিয়া চেষ্টা
তদন্ত চলাকালে এক কর্মচারীকে গোপনে সহকর্মীর কাছে নির্দেশনা পাঠাতে দেখা যায়—যেখানে ‘চুপ থাকো’ বা ‘কিছু বলো না’ ধরনের বার্তা ছিল। বিষয়টি ধরা পড়ার পর তিনি সেই কাগজ গিলে ফেলেন। এতে বোঝা যায়, তথ্য গোপন রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা মরিয়া ছিল।
‘তাই চি’ কৌশল: সময়ক্ষেপণ ও এড়ানোর চেষ্টা
কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি বাধা না দিলেও নানা অজুহাতে তদন্ত বিলম্বিত করার চেষ্টা করেছে। তারা বারবার ‘সিস্টেম আপডেট’, ‘ডেটা অ্যাক্সেস নেই’ বা ‘নেটওয়ার্ক ধীর’—এমন কারণ দেখিয়ে তথ্য দিতে দেরি করেছে। ফলে তদন্তকারীরা নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার দোকান যাচাই করে তথ্য সংগ্রহ করতে বাধ্য হন।
৬৭ হাজারের বেশি অবৈধ বেকারি
এই অভিযানে সাতটি প্ল্যাটফর্মে ৬৭ হাজারের বেশি লাইসেন্সবিহীন বেকারির সন্ধান পাওয়া যায়। এসব বেকারি সরাসরি কাজ না করে মধ্যস্থতাকারী প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্ডার গ্রহণ করত। বড় অ্যাপ থেকে অর্ডার নিয়ে তা কম দামে অজানা রান্নাঘরে পাঠানো হতো।
মধ্যস্থতাকারী ব্যবসার অস্বচ্ছতা
একটি উদাহরণে দেখা যায়, একজন ক্রেতা ২৫২ ইউয়ানে কেক কিনলেও প্রকৃত প্রস্তুতকারক পেয়েছে মাত্র ৭৬ ইউয়ান। বাকিটা ভাগ হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, মধ্যস্থতাকারী ও তালিকাভুক্ত দোকানের মধ্যে। এতে প্রকৃত উৎপাদক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়েছে।

কেন এতদিন চলছিল এই অনিয়ম
নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানায়, অনেক প্ল্যাটফর্ম ইচ্ছাকৃতভাবে এসব অনিয়ম সহ্য করেছে। কারণ কঠোর নিয়ম আরোপ করলে বিক্রেতারা অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যেতে পারে—এই ভয় থেকেই তারা কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি।
উপসংহার
চীনের এই অভিযান শুধু খাদ্য নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতির ভেতরের অস্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও তুলে ধরেছে। সহিংসতা, তথ্য গোপন এবং নিয়ন্ত্রণ এড়ানোর কৌশল দেখিয়ে দিয়েছে—এই খাতকে সুশাসনের আওতায় আনতে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















