মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীর জাহাজ চলাচল সংকট চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বেইজিং এখন তার সামগ্রিক জ্বালানি কৌশল পুনর্মূল্যায়নের পথে এগোচ্ছে, কারণ দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং রাষ্ট্রীয় পরিষদের (স্টেট কাউন্সিল) একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আহ্বান করেন, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা ও খাতের রূপান্তর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এই বৈঠকে উপপ্রধানমন্ত্রী ডিং শুয়েসিয়াং-সহ শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার প্রেক্ষাপটে সতর্কতা ও প্রস্তুতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও চীনের সতর্কতা
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত শুরুর পর থেকেই বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চীনকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
প্রথম প্রান্তিকের তথ্য বলছে, সংঘাত ও হরমুজ সংকটের প্রভাব সত্ত্বেও চীনের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। এই সময়ে দেশটির জিডিপি ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। যুদ্ধের আগে তেল মজুত করার কৌশল এই স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আমদানি নির্ভরতা: বড় কৌশলগত দুর্বলতা
তবে চীনের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো তেলের ওপর অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা। দেশটি তার মোট তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে, যার একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। ফলে এই রুটে কোনো বিঘ্ন সরাসরি জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার আহ্বান
এই প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান-এর সঙ্গে আলোচনায় হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার আহ্বান জানান। এটি ছিল এই সংকট নিয়ে তার প্রথম প্রকাশ্য অবস্থান, যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
চীন এখন আমদানি নির্ভরতা কমাতে জ্বালানি কাঠামো পরিবর্তনের দিকে জোর দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতের সমাধান হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।
বায়ু বিদ্যুৎ, সৌর শক্তি, জলবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারে সবুজ ও নিম্ন-কার্বন রূপান্তর ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানির বাস্তবতা
তবে বাস্তবতা হলো, চীন এখনও পুরোপুরি কয়লার ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তাই আপাতত পরিষ্কার ও দক্ষ পদ্ধতিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আধুনিকীকরণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ গ্রিড উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাজার সংস্কার ও প্রণোদনা
সবুজ জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে জাতীয় বিদ্যুৎ বাজার সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদক ও ব্যবহারকারীদের প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার আরও ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৌশলগত মজুত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
চীনের শীর্ষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী সংস্থার প্রধান ঝেং শানজিয়ে জানিয়েছেন, দেশটি খাদ্য ও জ্বালানির কৌশলগত মজুত আরও শক্তিশালী করবে।
এর পাশাপাশি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, চীন এখন একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















