বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক আগামী ১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব ছাড়ছেন। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় নেতৃত্ব দেওয়ার পর তিনি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন প্রতিষ্ঠানেরই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা জন টারনাস।
নতুন নেতৃত্বে অ্যাপল
অ্যাপলের ঘোষণায় বলা হয়েছে, বহু বছর ধরে হার্ডওয়্যার বিভাগের নেতৃত্ব দেওয়া জন টারনাস এখন কোম্পানির নতুন প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। নিজের প্রতিক্রিয়ায় টারনাস জানিয়েছেন, এই দায়িত্ব পাওয়া তাঁর জন্য বড় সম্মানের বিষয় এবং তিনি অ্যাপলের লক্ষ্য ও দর্শনকে সামনে এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং টিম কুকের কাছ থেকে শেখা তাঁর পথচলাকে সমৃদ্ধ করেছে।

টিম কুকের নতুন ভূমিকা
দায়িত্ব ছাড়লেও টিম কুক অ্যাপলের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন। নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি কোম্পানিকে সহায়তা করবেন এবং বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। নিজের বক্তব্যে কুক অ্যাপলের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করে বলেন, উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল এক দলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া তাঁর জীবনের বড় অর্জন।
অ্যাপলের সাফল্যের অধ্যায়
টিম কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান কোম্পানিতে পরিণত হয়। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রথম ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যের কোম্পানি হিসেবে ইতিহাস গড়ে। তাঁর সময়েই বাজারে আসে জনপ্রিয় পণ্য যেমন অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডস। পাশাপাশি অ্যাপল মিউজিক ও অ্যাপল টিভির মতো সেবাভিত্তিক ব্যবসা থেকেও বিপুল আয় শুরু হয়।
তবে সব উদ্যোগ সফল হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলা অ্যাপলের গাড়ি প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন পায়নি। নতুন প্রযুক্তি পণ্য নিয়েও কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া পাওয়া যায়নি, যা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে কোম্পানির ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে। তবুও আইফোনসহ মূল পণ্যের ধারাবাহিক সাফল্য অ্যাপলকে শীর্ষে ধরে রেখেছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক
টিম কুকের সময়ে অ্যাপলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল চীনের সঙ্গে সম্পর্ক। উৎপাদন ও বাজার—দুই ক্ষেত্রেই চীন অ্যাপলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনা সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা কোম্পানির সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনের সঙ্গেও কুককে জটিল সম্পর্ক সামলাতে হয়েছে। দেশটির নীতিমালার পরিবর্তনের কারণে এশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে অ্যাপল যুক্তরাষ্ট্রে চিপ উৎপাদনে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা-বিরোধী অভিযোগে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
জন টারনাসের পথচলা
নতুন প্রধান নির্বাহী জন টারনাস দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপলের সঙ্গে যুক্ত। ২০০১ সালে তিনি কোম্পানিতে যোগ দেন এবং শুরুতে ডিসপ্লে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আইম্যাক ও আইপ্যাডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেন।
ক্রমে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তাঁর দায়িত্ব বাড়তে থাকে এবং ২০২০ সালে আইফোন বিভাগের তত্ত্বাবধান পান। ২০২১ সালে তিনি অ্যাপলের হার্ডওয়্যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে তাঁকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য উপযুক্ত মনে করা হচ্ছে।

পরিবর্তনের পথে অ্যাপল
টিম কুকের বিদায় অ্যাপলের জন্য একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা। নতুন নেতৃত্বে কোম্পানিটি কীভাবে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রাখবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তবে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় অ্যাপল তার উদ্ভাবনী যাত্রা অব্যাহত রাখবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















