মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে। সাম্প্রতিক হামলা ও হুমকির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
সংঘাতের প্রভাব: জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ
যুদ্ধ শুরুর প্রায় আট সপ্তাহ পর দেখা যাচ্ছে, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। একদিনে যেখানে আগে শতাধিক জাহাজ চলত, সেখানে এখন অনেক সময় একটিও জাহাজ পার হতে পারছে না। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও ইরানের নতুন হামলায় সেই আশাও দ্রুত ভেঙে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে এই প্রণালিকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে করে তারা আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।

জ্বালানি বাজারে ধাক্কা
স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। কিন্তু এখন সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। পেট্রোল, ডিজেল থেকে শুরু করে রান্না ও গৃহস্থালির গ্যাস—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং নৌ অবরোধ থাকা সত্ত্বেও ইরান এখনও এই প্রণালিতে প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইরান-সম্পর্কিত জাহাজগুলো তুলনামূলক বেশি চলাচল করছে, যা প্রমাণ করে তারা এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারায়নি।
অনেক জাহাজকে ইরানের অনুমতি নিয়ে চলতে হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট পথ ব্যবহার করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর ফলে আগের মতো স্বাধীনভাবে চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না।

সাম্প্রতিক হামলা ও আতঙ্ক
সাম্প্রতিক এক ঘটনায় দুটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার অভিযোগ উঠেছে। একটি জাহাজে সশস্ত্র নৌযান থেকে গুলি চালানো হয় বলে জানা গেছে। যদিও এতে কোনো হতাহত হয়নি, তবে এই ধরনের হামলা জাহাজ চলাচলে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ঘটনার পর অনেক জাহাজ মাঝপথেই ফিরে গেছে বা যাত্রা স্থগিত করেছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মার্কিন অবরোধ ও বিতর্ক
ইরানের তেল রপ্তানি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ জোরদার করেছে। তাদের দাবি, কোনো ইরানি জাহাজ এই অবরোধ ভাঙতে পারেনি। তবে কিছু বিশ্লেষণ বলছে, কয়েকটি জাহাজ অবরোধ অতিক্রম করতে পেরেছে—যা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিতে পূর্ণমাত্রায় নৌবাহিনী মোতায়েন না করায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও তারা হেলিকপ্টার মোতায়েন করে নজরদারি চালাচ্ছে।

অস্থির ভবিষ্যৎ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যদি হামলা চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে শিপিং কোম্পানিগুলো এই পথ এড়িয়ে চলবে। এতে বৈশ্বিক বাণিজ্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অল্প সময়ের জন্যও নিরাপত্তা নিশ্চিত না থাকলে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা কঠিন হবে। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















