পর্যটকে ভরা জিব্রাল্টারের পাহাড়চূড়ায় বানরদের খাবার চাওয়া বা ছিনিয়ে নেওয়া খুবই পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের দেওয়া অতিরিক্ত মিষ্টি ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর এই বানররা এক অদ্ভুত অভ্যাস গড়ে তুলেছে—মাটি খাওয়া, যা তাদের পেটের সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
জাঙ্ক ফুডের প্রভাব ও মাটি খাওয়ার প্রবণতা
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, যেসব বানর পর্যটকদের কাছ থেকে বেশি খাবার পায়—যেমন চকোলেট, চিপস বা আইসক্রিম—তাদের মধ্যে মাটি খাওয়ার প্রবণতা বেশি। এই খাবারগুলোতে চিনি, চর্বি ও দুগ্ধজাত উপাদান বেশি থাকলেও আঁশ কম থাকে, যা বানরদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানানসই নয়। ফলে তাদের হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস বানরদের অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণু ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। আর সেই ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে মাটি খাওয়া এক ধরনের প্রতিরোধমূলক আচরণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

মাটি কি অ্যান্টাসিডের মতো কাজ করে?
গবেষণার প্রধান গবেষক সিলভাঁ লেমোইনের মতে, মানুষের ক্ষেত্রে যেমন অ্যান্টাসিড পেটের অম্লতা কমায়, তেমনি বানরদের ক্ষেত্রে মাটি খাওয়াও একই ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কাদামাটির মতো উপাদান অন্ত্রের অম্লতা কমাতে, বিষাক্ত পদার্থ শোষণ করতে এবং অন্ত্রের পরিবেশকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করতে পারে।
তবে তিনি এটাও বলেছেন, মাটি সরাসরি জাঙ্ক ফুড হজমে সহায়তা করে না, বরং হজমের সময় অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে।
গবেষণার পরিসর ও তথ্য
২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত জিব্রাল্টারের প্রায় ২৩০টি বার্বারি ম্যাকাক বানরের ওপর এই গবেষণা চালানো হয়। ইউরোপে এরা একমাত্র মুক্তভাবে বসবাসকারী বানর প্রজাতি।
গবেষণায় দেখা যায়, মোট ৪৬ বার বানরদের মাটি খাওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা বেশি, সেখানেই এই আচরণ বেশি দেখা গেছে। গ্রীষ্মকালে, যখন পর্যটকের সংখ্যা সর্বোচ্চ থাকে, তখন এই প্রবণতাও বেড়ে যায়। বিপরীতে, যেসব বানরের মানুষের খাবারের সংস্পর্শ নেই, তাদের মধ্যে মাটি খাওয়ার আচরণ দেখা যায়নি।

সামাজিকভাবে শেখা আচরণ
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই মাটি খাওয়ার অভ্যাসটি সম্ভবত বানরদের মধ্যে সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। একেকটি বানরগোষ্ঠী নির্দিষ্ট ধরনের মাটি পছন্দ করে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অন্য বানরদের উপস্থিতিতে এই আচরণ ঘটে। এতে ছোট বানররা বড়দের দেখে শিখে নেয়।
পরিবর্তিত পরিবেশে অভিযোজন
এই গবেষণা দেখায়, মানুষের মতোই বানররাও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং নতুন আচরণ শিখতে সক্ষম। তবে এটি পর্যটকদের আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে—একদিকে অবৈধভাবে বানরদের খাওয়ানো নিরুৎসাহিত হতে পারে, আবার অন্যদিকে কেউ কেউ এই অদ্ভুত আচরণ দেখার আশায় উল্টো বেশি খাবার দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, গবেষণাটি প্রাণীদের অভিযোজন ক্ষমতা এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















