গরমের তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে গিয়ে লোডশেডিং পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটজনক হয়ে উঠছে।
বিদ্যুৎ ঘাটতির বাস্তব চিত্র
সরকারি তথ্য অনুযায়ী কয়েক দিন ধরে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং চলছে। তবে বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, প্রকৃত ঘাটতি সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। বুধবার একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ লোডশেডিং দেখা গেছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির হিসাবে বিকেলে ঘাটতি ছিল প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বেসরকারি তথ্য বলছে, প্রকৃত লোডশেডিং চার হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। দুপুরে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এলাকায় ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি ছিল। একই সময়ে ছয়টি বিতরণ কোম্পানির সম্মিলিত লোডশেডিং দেখানো হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট।

আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি ইউনিটের যন্ত্রাংশে সতর্ক সংকেত পাওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সেটি বন্ধ রাখা হয়েছে। মেরামতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এর ফলে রাতারাতি বিদ্যুৎ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আদানি থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ একসময় প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট থাকলেও তা কমে অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে আসে।
এই সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে। কোথাও কোথাও লোডশেডিং ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও ভোগান্তিকর করে তুলেছে।
জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। কয়লা, গ্যাস ও তেলের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে বাড়তি চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে উঠেছে।

চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান
সাম্প্রতিক দিনে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। কিন্তু উৎপাদন কম থাকায় এ সময় প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। দুপুরের পর গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বেড়েছে এবং রাতের পিক সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একইভাবে আগের দিন রাতে চাহিদা ১৬ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও উৎপাদন ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৬২৩ মেগাওয়াট। এতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা
দেশে মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও সবগুলো থেকে উৎপাদন হচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে কিছু কেন্দ্র বন্ধ, জ্বালানি তেলের সংকটে আরও কিছু বন্ধ রয়েছে, আবার রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও কয়েকটি কেন্দ্র চালু নেই। এছাড়া সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রাতে উৎপাদন করতে পারে না এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে কিছু ডিজেলচালিত কেন্দ্রও বন্ধ রাখা হয়।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সংকটের কারণে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও বাস্তবে উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে।
সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ও চাহিদার এই বড় ব্যবধানের কারণেই দেশে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















