ইরানের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামো আমূল বদলে গেছে। নতুন নেতা হিসেবে তাঁর ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নিলেও বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ক্ষমতা এখন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর জেনারেলদের হাতে চলে গেছে।
নতুন নেতৃত্ব: নামমাত্র নেতা, বাস্তব ক্ষমতা অন্যত্র
আগের মতো একক নেতৃত্ব আর নেই। আলী খামেনি জীবিত থাকাকালে যুদ্ধ, শান্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা—সবকিছুতেই তাঁর ছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কিন্তু মোজতবা খামেনি সেই একই প্রভাবশালী অবস্থানে নেই। তিনি অনেকটা পরিচালনা পর্ষদের প্রধানের মতো ভূমিকা পালন করছেন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে জেনারেলদের পরামর্শ ও সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে।
গোপন অবস্থান ও সীমিত যোগাযোগ
নতুন সর্বোচ্চ নেতা বর্তমানে আড়ালে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ অত্যন্ত সীমিত। বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে হাতে লেখা চিঠির মাধ্যমে, যা একাধিক নিরাপদ মাধ্যম পেরিয়ে পৌঁছায়।
বিপ্লবী গার্ডের উত্থান
ইসলামি বিপ্লবের পর গঠিত এই বাহিনী ধীরে ধীরে রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। তবে আগে তারা সর্বোচ্চ নেতার অধীনেই কাজ করত। কিন্তু আলী খামেনির মৃত্যুর পর সৃষ্ট শূন্যতায় তারা সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ভাহিদি, মোহাম্মদ বাঘের জোলঘদর এবং ইয়াহিয়া রহিম সাফাভির মতো শীর্ষ জেনারেলরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের হাতে রয়েছে সামরিক কৌশল, কূটনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ।
যুদ্ধ ও কূটনীতিতে জেনারেলদের নিয়ন্ত্রণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনায় জেনারেলরাই কৌশল নির্ধারণ করছেন। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি, আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের সিদ্ধান্তও তাদের হাতেই নেওয়া হচ্ছে।
এমনকি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে আলোচনার নেতৃত্বে আনা হয়েছে, যা জেনারেলদের প্রভাব আরও স্পষ্ট করে।
সরকারের ভূমিকা কমে যাওয়া
নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং তাঁর মন্ত্রিসভাকে মূলত অভ্যন্তরীণ বিষয়—খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের মতো কাজেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও অনেকটাই কমে গেছে।
মতবিরোধ ও সিদ্ধান্তের দ্বন্দ্ব
যদিও সরকার ও কূটনৈতিক মহল আলোচনার পক্ষে ছিল, জেনারেলরা কঠোর অবস্থান নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং ইরানি জাহাজ আটকানোর ঘটনায় তারা আলোচনাকে অকার্যকর বলে মনে করে। ফলে দ্বিতীয় দফার আলোচনা ভেঙে যায়।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তুলে প্রেসিডেন্ট আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত জেনারেলদের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়।
কঠোরপন্থীদের চাপ
ইরানের ভেতরে একটি কঠোরপন্থী গোষ্ঠী কোনো ধরনের আপসের বিরোধিতা করছে। তারা বিশ্বাস করে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে ইরান জয়ী হতে পারবে। এই গোষ্ঠী রাস্তায় বিক্ষোভ করছে এবং নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো অনেকটাই সামরিককেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা হবে কি না, কিংবা পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান কতটা ছাড় দেবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
একটি বিষয় পরিষ্কার—ইরানে এখন ক্ষমতার কেন্দ্র বদলে গেছে, এবং সেই কেন্দ্রের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে সামরিক নেতৃত্ব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















