বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেশের জ্বালানির চাহিদাকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলেছে এবং একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতাও বাড়ছে—এমনটাই জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে।
জ্বালানি রূপান্তরের সম্ভাবনা
এডিবির ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তর এবং কম-কার্বন ভবিষ্যৎ পথ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কম-কার্বন সমাধানে যাওয়া সম্ভব হলেও এর জন্য শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা, বিনিয়োগ এবং মানুষের আচরণগত পরিবর্তন প্রয়োজন।
অবকাঠামো ঘাটতি ও ব্যবসায়িক ব্যয়
দেশের পরিবহন অবকাঠামোর দুর্বলতা ব্যবসায়িক খরচ বাড়াচ্ছে, প্রতিযোগিতা কমাচ্ছে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যকে সীমিত করছে। এই সমস্যা সমাধানে ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ উন্নয়ন ও নির্মাণে ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে এডিবি, যা দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডরের অংশ।
রেল খাতে উন্নয়ন ও সম্ভাবনা
এই বিনিয়োগের মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সহজ হবে, রেল পরিচালনা আরও টেকসই হবে এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী লোকোমোটিভ চালু করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি রেলকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও পরিচালন মান বাড়বে। এতে ভ্রমণের সময় কমবে, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়বে এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ব্যাংকিং খাত প্রাধান্য পেলেও দুর্বল শাসন, তদারকির অভাব এবং মূলধনের ঘাটতির কারণে এই খাত পুরোপুরি কার্যকর হতে পারছে না। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সীমিত হচ্ছে এবং অনেক মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ব্যাংকিং সংস্কারে সহায়তা
এই পরিস্থিতি উন্নয়নে ২০২৫ সালে এডিবি ৫০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক তদারকি জোরদার, সুশাসন উন্নয়ন, সম্পদের মান বৃদ্ধি এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
কক্সবাজারে শরণার্থী সংকট
কক্সবাজারে এক মিলিয়নের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নেওয়ায় স্থানীয় অবকাঠামো ও সেবার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। এডিবি এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫৮.৬ মিলিয়ন ডলারের অনুদান এবং ২৮.১ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে।
এই সহায়তার আওতায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা বাড়ানো এবং প্রায় ১২,৫০০ সৌরচালিত সড়কবাতি স্থাপন করা হচ্ছে, যা বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও শরণার্থীদের মধ্যে সম্পর্কও উন্নত হবে।
পোশাক শিল্পে চাপ ও পরিবর্তন
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পোশাক খাত, যা দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এনে দেয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাহিদা বাড়ায় এই খাতের ওপর আধুনিকায়ন ও পরিবেশগত প্রভাব কমানোর চাপ বাড়ছে।
এডিবির বৈশ্বিক কার্যক্রম
২০২৫ সালে এডিবি নিজস্ব তহবিল থেকে ২৯.৩ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করেছে।
এডিবি সভাপতি মাসাতো কান্দা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে সংস্থাটি আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি সহায়তা দিয়েছে, যা প্রায় ৩৩ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ১৮ কোটির বেশি মানুষের উপকারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিনিয়োগের খাত ও অগ্রাধিকার
ঋণ, অনুদান, বিনিয়োগ ও কারিগরি সহায়তা মিলিয়ে মোট সহায়তা ২০ শতাংশ বেড়ে ২৯.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার সঙ্গে অংশীদারদের অতিরিক্ত ১৪.৭ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে।
বেসরকারি খাত উন্নয়ন ছিল অন্যতম অগ্রাধিকার, যেখানে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি খাতের প্রায় অর্ধেক বিনিয়োগ অবকাঠামো, সংস্কার ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণে ব্যয় করা হয়েছে, যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে।
অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দ
এডিবি বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ করেছে—মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় ৮.৩ বিলিয়ন ডলার, পূর্ব এশিয়ায় ১.৪ বিলিয়ন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৬৮০ মিলিয়ন, দক্ষিণ এশিয়ায় ৯.৭ বিলিয়ন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৯ বিলিয়ন ডলার। আঞ্চলিক প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৩০২ মিলিয়ন ডলার।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
২০২৫ সালে এডিবি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অনুমোদন করেছে, যার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















