বাংলাদেশে নতুন নির্বাচিত সরকারের সামনে এখন এক কঠিন ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সময়—এমন মন্তব্য করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। সংস্থাটি বলেছে, এসব প্রতিদ্বন্দ্বী চাপ বিএনপি কীভাবে সামাল দেয়, সেটিই আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের গতিপথ নির্ধারণ করবে। তাদের মতে, সরকার যদি অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, তবে জনসেবা উন্নয়ন, আইনের শাসন শক্তিশালী করা এবং বৃহত্তর সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু কর্মসংস্থান, সুশাসন ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থ হলে দেশ আবারও অস্থিরতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখে পড়তে পারে।
ক্রাইসিস গ্রুপের এশিয়া ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর বিএনপির সামনে একটি সীমিত সময়ের সুযোগ রয়েছে, যার মধ্যে দ্রুত অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংস্কারে হাত দিতে হবে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলা নতুন সরকারের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে জুলাই চার্টার ঘিরে বিরোধী দলের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে না গিয়ে বাস্তবমুখী সংস্কারে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার
ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, নতুন সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। অন্তর্বর্তী প্রশাসন কিছু সংস্কার শুরু করলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদের হার বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছে। ফলে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে, আর মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে বটে, তবে অর্থনীতি এখনো তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়নির্ভর, যা বৈশ্বিক ধাক্কায় দ্রুত চাপে পড়ে যেতে পারে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার সরবরাহের বড় অংশ ওই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার প্রভাব ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সংকট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ ফেলবে, স্থানীয় মুদ্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, প্রবৃদ্ধি কমাবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে লাখো মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সংস্কার, নিরাপত্তা ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একাই যথেষ্ট নয়—বাংলাদেশিরা এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বাস্তব সক্ষমতা, জননিরাপত্তা এবং পরিষ্কার প্রশাসনিক আচরণ দেখতে চায় বলেও মনে করছে ক্রাইসিস গ্রুপ। বিএনপিকে তাই শুধু অর্থনীতি নয়, রাজনৈতিক সংস্কার, সুশাসন এবং আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও সরকারকে সংবেদনশীলভাবে এগোতে হবে। সংস্থাটি মনে করে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা দলটির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
ক্রাইসিস গ্রুপের পর্যবেক্ষণ হলো, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এ সুযোগকে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় রূপ দিতে হলে বিএনপিকে দ্রুত ফল দেখাতে হবে। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ক্ষমতাসীনদের প্রতি জনসমর্থন ধরে রাখা এখানে সহজ নয়। যদি সরকার বিদ্রোহ-উত্তর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন করে অসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















