যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথ নিরাপদ রাখার দায়িত্বে থাকা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের একটি বড় অংশ নীরবে মানসিক সংকটে ভুগছেন। উচ্চচাপের কাজ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কারণে অনেকেই নিজের সমস্যাগুলো গোপন রাখতে বাধ্য হচ্ছেন—যার ফল কখনো কখনো মর্মান্তিক।
লুকানো চাপ, অদৃশ্য সংকট
প্রতিদিন হাজার হাজার ফ্লাইট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এই পেশাজীবীরা চরম চাপের মধ্যে কাজ করেন। কিন্তু মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকায় অনেকেই চিকিৎসা নিতে পিছপা হন। ফলে সমস্যা জমতে থাকে ভেতরে ভেতরে।
ন্যাশনাল এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ১২ জন কন্ট্রোলার আত্মহত্যা করেছেন—যা জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অথচ অনেক ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্তই হয় না।

কাজের চাপ ও নিয়মের জটিলতা
দীর্ঘদিন ধরে কর্মীসংকট, অতিরিক্ত শিফট, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকার মতো ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। অনেক কন্ট্রোলারকে সপ্তাহে ছয় দিন, প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। এতে ব্যক্তিগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বাড়ছে মানসিক ক্লান্তি।
এফএএ’র নিয়ম অনুযায়ী, কন্ট্রোলারদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মানসিক চিকিৎসার তথ্য প্রকাশ করতে হয়। নতুন কোনো মানসিক সমস্যার তথ্য দিলে অতিরিক্ত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয়, যা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। এতে অনেকে চিকিৎসা নেওয়া এড়িয়ে যান।
‘সবকিছু চেপে রাখা’ সংস্কৃতি
শিল্পখাতের ভেতরে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যেখানে মানসিক সমস্যা লুকিয়ে রাখাই যেন স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে সংকট আরও গভীর হবে।
২০২৪ সালে এফএএ-নিযুক্ত একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলও বলেছে, শিল্পখাতের সংস্কৃতি মানসিক সমস্যার রিপোর্টিং কমিয়ে দিচ্ছে। তারা ২৪টি সুপারিশ দিয়েছে, যার কিছু বাস্তবায়ন শুরু হলেও অনেক কিছু এখনো বাকি।

ব্যক্তিগত গল্পে উঠে আসে বাস্তবতা
জোশুয়া অ্যাডামস, একজন অভিজ্ঞ কন্ট্রোলার, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ভুগছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা নিলে চাকরি হারানোর ভয় তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করে। পরিবারের দায়িত্ব, কাজের চাপ এবং অনিশ্চয়তা মিলিয়ে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মহত্যা করেন—পিছনে রেখে যান স্ত্রী ও দুই সন্তান।
তার স্ত্রী ডেভি এখন এই সংকট নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন, “মানুষকে তাদের অনুভূতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ দিতে হবে।”
পরিবর্তনের উদ্যোগ
নতুন আইন প্রস্তাবের মাধ্যমে এফএএকে বাকি সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য বাধ্য করা হতে পারে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজ করা এবং সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সাংগঠনিক মানসিকতা বদলানো—যেখানে সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হবে।
মানসিক চাপে থাকা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের সংকট সামনে এনে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি অদৃশ্য দিক উন্মোচিত হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যারা কাজ করেন, তাদের নিজেদের নিরাপত্তাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















