বিশ্বজুড়ে প্রায় নিয়ন্ত্রিত এক রোগ হিসেবে বিবেচিত হাম আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি রোগের পুনরুত্থান নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর সমস্যার সতর্ক সংকেত। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর ইতোমধ্যে ১,৭০০-র বেশি হাম আক্রান্তের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যেখানে ২০০০-এর দশকের শুরুতে এই সংখ্যা বছরে গড়ে মাত্র ৭০ ছিল। গত বছর এই রোগে তিন শিশুর মৃত্যুও হয়েছে।
টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা
জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, হাম মূলত একটি ‘সতর্কবার্তা’। টিকাদান কর্মসূচিতে ফাঁক তৈরি হলেই এ ধরনের সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুধু হামই নয়, হুপিং কাশি ও অন্যান্য সংক্রমণও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে টিকা নিয়ে ভুল তথ্য ও ভীতি ছড়ানো।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে টিকাবিরোধী প্রচারণা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। ফলে অনেক অভিভাবক টিকা নিতে দ্বিধায় পড়ছেন, যা সামগ্রিক টিকাদানের হার কমিয়ে দিচ্ছে। অথচ হাম প্রতিরোধে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকাপ্রাপ্ত থাকা জরুরি, কিন্তু অনেক অঞ্চলে এই হার ইতোমধ্যে তার নিচে নেমে গেছে।
ভুল তথ্যের প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা নতুন কিছু নয়। ১৯৯৮ সালে একটি গবেষণায় টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক দেখানো হয়েছিল, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়। কিন্তু সেই ভীতি এখনও অনেক মানুষের মনে রয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিভাজন এই ভ্রান্ত ধারণাকে আরও বিস্তার করেছে।
করোনাভাইরাস মহামারি শুরুতে টিকার ওপর আস্থা বাড়াতে পারলেও পরে সেটিও রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। ফলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে এবং অন্যান্য রোগের টিকাদান হারও কমতে শুরু করেছে।

সমাজজুড়ে ঝুঁকি
টিকাদান কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু যারা টিকা নেয়নি তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। নবজাতক, যাদের এখনও টিকা দেওয়া সম্ভব নয়, তারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। একইভাবে দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ, যেমন ক্যানসার চিকিৎসাধীন রোগীরাও ঝুঁকিতে পড়ে। এমনকি টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও প্রায় ৩ শতাংশ পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকে না।
এর ফলে হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ে, কোয়ারেন্টিন, স্কুল বন্ধসহ নানা সামাজিক ব্যাঘাত তৈরি হতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি বড় ধরনের সংকটের পূর্বাভাস।
সমাধানের পথ কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা। চিকিৎসক, ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক ব্যক্তিত্বদের এগিয়ে এসে সহজ ভাষায় টিকার উপকারিতা বোঝাতে হবে। জটিল পরিসংখ্যানের বদলে বাস্তব জীবনের উদাহরণ মানুষকে বেশি প্রভাবিত করতে পারে।
এছাড়া টিকা সহজলভ্য করা, স্কুল ও কমিউনিটিতে অস্থায়ী ক্লিনিক চালু করা এবং অপ্রয়োজনীয় ছাড় কঠোর করা প্রয়োজন। পরিবারগুলোর কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞরা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, টিকা প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচায়। এটি নিরাপদ এবং কার্যকর। তাই টিকা নিয়ে দ্বিধা বা ভ্রান্ত ধারণা দূর করা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
আমরা হয়তো টিকার সাফল্যের কারণেই অতীতের ভয়াবহ রোগগুলো ভুলে গেছি। কিন্তু সেই ভুলে যাওয়াই এখন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। যদি এখনই সতর্ক না হওয়া যায়, তাহলে অতীতের সেই দুর্ভোগ আবার ফিরে আসতে পারে।
আমেরিকায় হাম বাড়ছে, টিকাদানে অনীহা ও ভুল তথ্যের কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে—বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















