কলকাতা, ২৬ এপ্রিল। দহনজ্বলা রবিবার বিকেলে নিজের পরিচিত রাবারের স্যান্ডেল আর সাদামাটা সাদা শাড়ি পরে ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়া এলাকা থেকে বেরিয়ে এলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আগের রাতেই প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি কর্মীদের মাইকের আওয়াজে তাঁর সভা ব্যাহত হওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তাঁর।
ভিড়ের উল্লাসের মাঝে এক বৃদ্ধ শিখ ভদ্রলোক এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরলেন। সেই মুহূর্তে মমতা আবারও যেন ‘রাস্তার লড়াকু নেত্রী’ হিসেবেই ধরা দিলেন, যিনি এতদিন বিজেপির প্রবল চ্যালেঞ্জ ঠেকিয়ে রেখেছেন। পদযাত্রার সময় ভিড় সামলাতে গিয়ে পুলিশকে তাঁর বলতে শোনা যায়, “ওদের আসতে দাও, সবাই আমার চেনা লোক।”
ল্যান্সডাউন থেকে কালীঘাটের ফায়ার স্টেশন পর্যন্ত এই পদযাত্রার পরদিন দক্ষিণ কলকাতার একাধিক জনসভায় ব্যস্ত সময় কাটানোর কথা ছিল তাঁর।
নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা
২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটের আগে বিজেপি নেতা শিশির বাজোরিয়া মন্তব্য করেছিলেন, মমতা মঞ্চে কিছুটা নার্ভাস দেখাচ্ছেন এবং তাঁর বক্তব্যে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে সেই নার্ভাসনেসের ছাপ যেন হঠাৎ করেই মিলিয়ে যায়। পরদিনই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে মমতা ঘোষণা করেন, “বাংলায় জিতেই দিল্লি দখল করব। সব বিরোধী দলকে একত্র করে বিজেপিকে সরিয়ে দেব।”
অন্যদিকে, প্রায় ৭৬ কিলোমিটার দূরে বনগাঁয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মমতার সরকারকে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক অবনতির জন্য দায়ী করেন। তিনি বলেন, একসময় এই অঞ্চলে অসংখ্য পাটকল ও কারখানা ছিল, এখন সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, শুধু ‘কাটমানির দোকান’ টিকে আছে।

মতুয়া সম্প্রদায়ের গুরুত্ব
বনগাঁ সফরের আগে মোদি ঠাকুরনগর যান, যেখানে প্রায় ৩০ লাখ মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। এই সম্প্রদায়ের অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে। নাগরিকত্ব নিয়ে এই সম্প্রদায়ের উদ্বেগ প্রশমিত করাই ছিল প্রধানমন্ত্রীর সফরের লক্ষ্য।
উত্তর ২৪ পরগনার এক গ্রামে মতুয়া সমাজের এক প্রতিনিধি বলেন, প্রায় প্রতিটি গ্রামেই শত শত মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এমনকি তরুণীরাও জানতে চাইছে, তাঁদের আর কখনও ভোট দিতে পারবে কি না।
ভবানীপুরে শক্ত ঘাঁটি
ভবানীপুর আসনে ২০১১ সাল থেকে তৃণমূলের প্রভাব অটুট। যদিও বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী এখানে জোর প্রচার চালাচ্ছেন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটে প্রভাব ফেলতে চেষ্টা করছেন।
এই আসনকে প্রায় ‘মিনি ভারত’ বলা হয়, যেখানে বাঙালির পাশাপাশি গুজরাতি, শিখ, তামিল ও উত্তর ভারতের মানুষের বসবাস। মুসলিম ভোটার প্রায় এক-চতুর্থাংশ হলেও ভোটার তালিকা সংশোধনে তাঁদের অনেকেই বাদ পড়েছেন।
তবে গতবার মমতা এখানে প্রায় ৫৮ হাজার ভোটে জিতেছিলেন, যা বিশ্লেষকদের মতে এখনও অপ্রতিরোধ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবানীপুরকে শেষ মুহূর্তের প্রচারের জন্য রেখে অন্যত্র প্রচারে মন দেওয়া তাঁর পুরনো কৌশল, যা আগেও সফল হয়েছে।
শেষ লড়াইয়ের আবহ
প্রচারের শেষ পর্যায়ে এসে রাজ্যের রাজনৈতিক চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে স্থানীয় শক্তির উপর নির্ভরশীল শাসক দল, অন্যদিকে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে জাতীয় দল।
ভোটারদের মধ্যে নাগরিকত্ব, জীবিকা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এখন বড় প্রশ্ন, কে শুধু প্রচারের আওয়াজে নয়, সেই সমর্থনকে ভোটে রূপান্তর করতে পারবে—যখন আগামী বুধবার আবার ভোটের বাক্স খুলবে পশ্চিমবঙ্গ।
জয়ন্ত রায় চৌধুরী 


















