ব্রিটেনের রাজনীতিতে আবারও অস্থিরতার ছাপ। সরকার চলছে, কিন্তু কার্যকরভাবে শাসন হচ্ছে কি না—এই প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে দলীয় ভেতর-বাইরে অসন্তোষ বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে সামনে আসছে শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক ভুলের জটিল চিত্র।
নিয়োগ বিতর্কে থমকে সরকার
গত এক সপ্তাহ ধরে ব্রিটিশ সরকারের কার্যক্রম কার্যত থেমে ছিল একটি নিয়োগ সিদ্ধান্তকে ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে শুরু করে মন্ত্রিসভার প্রায় সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন জবাবদিহিতে। সংসদে এই বিষয়েই সময় ব্যয় হয়, যেখানে বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হয় পুরো প্রক্রিয়া। ফলে অন্যান্য জরুরি রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো পিছিয়ে পড়ে।
‘অশাসনযোগ্য’ ধারণার উত্থান

ব্রিটিশ রাজনীতির ভেতরে একটি ধারণা শক্তিশালী হয়ে উঠছে—দেশটি নাকি ‘অশাসনযোগ্য’। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও প্রকাশ্যে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তার মতে, সরকারের হাতে ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। নীতিনির্ধারণে জটিলতা ও প্রশাসনিক ধীরগতিকে দায়ী করা হচ্ছে, তবে সমালোচকদের মতে সমস্যার বড় অংশই সরকারের নিজের তৈরি।
নিজের সিদ্ধান্তেই জটিলতা
বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের নেতৃত্বে কিছু বড় সিদ্ধান্ত উল্টো ফল দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও অপসারণ নিয়ে একের পর এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কখনও কাউকে অদক্ষতার অভিযোগে সরানো হয়েছে, আবার কখনও বলা হয়েছে তারা যথেষ্ট কঠোর ছিলেন না। এতে প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং সরকারের ওপর আস্থা কমেছে।
অর্থনীতি ও নীতিতে দ্বিধা
সরকার শুরুতেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর বৃদ্ধির পথ এড়িয়ে যায়। এর ফলে বিকল্প হিসেবে এমন কিছু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যা ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা সংস্কার নিয়ে ভুল পদক্ষেপ দলীয় বিদ্রোহের জন্ম দেয়। ফলে সরকার অনেক সাধারণ আইন পাস করতেও অনিশ্চয়তায় পড়ে।

রাজনৈতিক সমর্থন কমে যাওয়া
একসময় বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও এখন সেই শক্তি ধরে রাখতে পারছেন না স্টারমার। অনেক সংসদ সদস্যই তার নেতৃত্ব নিয়ে সন্দিহান। তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে তিনি হয়তো টিকে থাকবেন না, ফলে তাকে ঘিরে রাজনৈতিক সমর্থনও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
প্রশাসন বনাম নেতৃত্ব
সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে অনেক সময় দায়ী করা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, সমস্যার মূল নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তে। প্রশাসন নিখুঁত না হলেও সম্পূর্ণ অকার্যকর নয়। বরং সঠিক নেতৃত্বের অভাবেই এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
আগামী নির্বাচনের আগে সরকার নতুন করে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা হতে পারে এবং নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করা হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক পুঁজি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং শক্তিশালী বিকল্পের অভাবেই সরকার এখনো টিকে আছে।
ব্রিটেন সত্যিই অশাসনযোগ্য কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট—শাসনক্ষমতা থাকলেও কার্যকর নেতৃত্ব ছাড়া তা কতটা কাজে লাগে?
স্টারমারের নেতৃত্ব এখন সেই পরীক্ষার মুখেই দাঁড়িয়ে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















