ব্রিটেনের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত হলেও এর ভেতরের বাস্তবতা অনেকটাই জটিল। বাইরে থেকে এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে হলেও, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা এতটাই গভীর যে একে পুরোপুরি আলাদা করা কঠিন।
নির্ভরতার শিকড় কোথায়
ব্রিটেনের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা মূলত ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল, যা সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। প্রযুক্তিগতভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র স্বাধীনভাবে চালানো সম্ভব হলেও এর পেছনের অধিকাংশ অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় গড়ে উঠেছে।
১৯৫৮ সালের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ১৯৬৩ সালের পোলারিস চুক্তি এই সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। এসব চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে এমন প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গড়ে ওঠে, যা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ভাগ করে না।
অস্ত্রের নকশা ও উপাদানে প্রভাব

তাত্ত্বিকভাবে ব্রিটেন নিজস্ব পারমাণবিক ওয়ারহেড ডিজাইন করে। তবে বাস্তবে এই ডিজাইন যুক্তরাষ্ট্রের মডেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বর্তমান ওয়ারহেডগুলোর অনেকাংশই আমেরিকান নকশা থেকে অনুপ্রাণিত বা সংশোধিত।
এছাড়া পারমাণবিক অস্ত্রের অ-পরমাণু উপাদান, বিশেষ করে অত্যাধুনিক উপকরণ, এখনও যুক্তরাষ্ট্র থেকেই আসে। ট্রিটিয়াম নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা বিস্ফোরণের ক্ষমতা বাড়ায়, সেটিও ব্রিটেন নিজে তৈরি করতে পারে না এবং আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
ক্ষেপণাস্ত্র ও পরীক্ষা ব্যবস্থায় নির্ভরতা
ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি যৌথ ঘাঁটিতে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। ব্রিটেন এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করে। এমনকি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণেও যুক্তরাষ্ট্রের সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়।
একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতার ঘটনায়ও দেখা গেছে, সমস্যার উৎস ছিল আমেরিকান প্রযুক্তিগত ত্রুটি। ফলে বোঝা যায়, এই ব্যবস্থায় দুই দেশের নির্ভরতা কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
সম্পূর্ণ স্বাধীন হতে কতটা সময় লাগবে

যদি যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়, তবে ব্রিটেন কিছু সময়ের জন্য বিদ্যমান অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে গেলে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র, উৎপাদন কারখানা এবং পরীক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুরো অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে এবং সময় লাগতে পারে দুই দশকেরও বেশি। একটি নতুন ওয়ারহেড তৈরি করতে ১৭ বছর এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রভিত্তিক ওয়ারহেড তৈরি করতে ২৪ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
বিকল্প পথ কতটা বাস্তবসম্মত
স্বাধীনতার আরেকটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে নতুন ধরনের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা। তবে সেটিও সহজ নয়, কারণ নতুন নকশা, পরীক্ষা ও যাচাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল।
অন্যদিকে অতীতে ফ্রান্স ব্রিটেনকে প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাব দিলেও সেটি গ্রহণ করা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এমন সহযোগিতা আবারও বিবেচনায় আসতে পারে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, ব্রিটেনের পারমাণবিক শক্তি পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এটি একদিকে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলেও অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই নির্ভরতা ভাঙতে গেলে শুধু সময়ই নয়, বিশাল অর্থ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দরকার হবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















