মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যা কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার প্রক্রিয়া থেকে পাশে সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বৈঠক এমন এক সময় হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা অনিশ্চয়তায় পড়ে আছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আরাঘচি পাকিস্তানে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছেন। তবে শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারকে পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেন। ট্রাম্প বলেন, ইরানের শান্তির প্রস্তাব যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা আলোচনার মতো অবস্থায় নেই। তিনি আরও জানান, ইরান চাইলে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে।
মস্কো সফরকে অনেকেই একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। বৈঠকে পুতিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত দাবি আগের দফার আলোচনাকে সফল হতে দেয়নি, যদিও সেখানে কিছু অগ্রগতি হয়েছিল। তিনি ইরানের জনগণের ‘সাহস ও বীরত্বের’ প্রশংসা করে বলেন, তারা নিজেদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে।
আলোচনায় স্থবিরতা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। ইরানের নেতৃত্ব, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর উপদেষ্টারা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়াকে নিজেদের অধিকার বলে মনে করছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান এই কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করুক এবং কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিক। এ পর্যন্ত উভয় পক্ষ কিছুটা আপসের ইঙ্গিত দিয়েছে—ইরান পাঁচ বছরের জন্য এবং যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য কর্মসূচি স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এই ব্যবধান এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এমনকি এই পার্থক্য মিটলেও, ইরানের বিদ্যমান ইউরেনিয়াম মজুত কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

হরমুজ প্রণালি ও অর্থনৈতিক চাপ
নতুন প্রস্তাবে পারমাণবিক ইস্যুটি আপাতত পাশে রেখে অর্থনৈতিক অবরোধ নিয়ে সমাধান খোঁজার কথা বলা হচ্ছে। ইরান চায়, তাদের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়া হোক। এর বিনিময়ে তারা হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের অবরোধ শিথিল করতে পারে।
তবে ইরান জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই প্রণালি আগের মতো পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকবে না। তারা জাহাজ চলাচলের ওপর টোল আরোপের অধিকার দাবি করছে, যা সম্ভবত ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত হতে পারে। তবে ওমান এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে এবং উন্মুক্ত চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আরাঘচি একই সময়ে ওমানের রাজধানী মাসকাটেও সফর করেছেন, যেখানে সুলতান হাইথামের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এই প্রস্তাবকে পছন্দ করেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সরাসরি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইরান যে ‘উন্মুক্ত প্রণালি’র কথা বলছে, তার অর্থ হলো—ইরানের অনুমতি নিয়ে চলাচল করতে হবে, নইলে হামলার ঝুঁকি থাকবে এবং টোল দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ ‘অর্থনৈতিক পারমাণবিক অস্ত্র’-এর মতো, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এমন পরিস্থিতিতে ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, তাহলে তা আরও ভয়াবহ হতো।
সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী সমঝোতা
যদি হরমুজ প্রণালি নিয়ে কোনো আংশিক সমঝোতা হয়, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য পুনরায় সচল হতে পারে। এটি ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য আস্থা তৈরির একটি ধাপ হতে পারে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে নির্বাচনের আগে অর্থনীতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিতে।
তবে এতে ঝুঁকিও রয়েছে। সামরিক চাপ কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের দরকষাকষির শক্তি কমে যেতে পারে। অন্যদিকে ইরানও দাবি করতে পারে, তারা আবারও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অমীমাংসিত সংঘাত
এই পরিস্থিতিতে লেবাননে যুদ্ধ এখনও পুরোপুরি থামেনি। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল সম্প্রতি বেকা উপত্যকায় বিমান হামলা চালিয়েছে, যেখানে লেবাননের কর্মকর্তাদের মতে অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে দুই নারী ও দুই শিশু রয়েছে। একই সময়ে হিজবুল্লাহর একটি ড্রোন হামলায় এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল পরিস্থিতিতে স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
রিচার্ড স্পেন্সার 



















