ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তেই নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদনকারী দেশটি এবার ডিজেলে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বায়োফুয়েল মেশানোর পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। এই উদ্যোগ শুধু দেশটির জ্বালানি নীতিকেই বদলে দিচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
জাভা দ্বীপ ঘিরে প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ পরীক্ষামূলক যাত্রা শেষ করেছে কয়েকটি ট্রাক ও একটি যাত্রীবাহী বাস। এই পরীক্ষা মূলত নতুন ‘বি৫০’ জ্বালানি মিশ্রণের কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য পরিচালিত হয়েছে। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় ‘বি৪০’ ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ডিজেলের সঙ্গে ৪০ শতাংশ পাম তেলভিত্তিক বায়োফুয়েল মেশানো হয়। নতুন পরিকল্পনায় সেই হার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে নেওয়া হবে।
জ্বালানি স্বনির্ভরতার লক্ষ্য
দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো খাদ্য ও জ্বালানিতে আত্মনির্ভরতার ওপর জোর দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন বায়োফুয়েল তুলনামূলক সস্তা হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে না, যা এই পরিকল্পনাকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি ইন্দোনেশিয়া সফলভাবে বি৫০ চালু করতে পারে, তাহলে মালয়েশিয়া, ব্রাজিলসহ অন্যান্য কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশ ডিজেলে মাত্র এক অঙ্কের বায়োফুয়েল মিশ্রণ ব্যবহার করে, সেখানে ইন্দোনেশিয়ার পরিকল্পনা নজিরবিহীন।

চ্যালেঞ্জও কম নয়
তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পথে রয়েছে নানা বাধা। বায়োডিজেল উৎপাদনের অন্যতম উপাদান মিথানলের ঘাটতি এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় মিথানলের দাম কয়েক মাসে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
এ ছাড়া উৎপাদন সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো দেশে বি৫০ চালু করতে হলে বর্তমান বায়োডিজেল উৎপাদন অন্তত ১২ শতাংশ বাড়াতে হবে। কিন্তু অনেক উৎপাদক এখনো অতিরিক্ত সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে দ্বিধায় রয়েছেন।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো অবকাঠামো। নতুন জ্বালানি সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। কয়েক মাস আগেও সরকার জানিয়েছিল, পূর্ণ বাস্তবায়নের আগে আরও সময় প্রয়োজন।
পাম তেলের বাজারে প্রভাব
ইন্দোনেশিয়া যদি আরও বেশি পাম তেল দেশের ভেতরে ব্যবহার করে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি কমে যেতে পারে। এতে বৈশ্বিক বাজারে পাম তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাম তেল বিশ্বের অসংখ্য খাদ্যপণ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রীতে ব্যবহৃত হয়। ফলে এর মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালের মধ্যে পুরোপুরি বি৫০ বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। অনেকের মতে, বাস্তবে আগামী বছর গড় মিশ্রণের হার ৪২ থেকে ৪৩ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে এবং পূর্ণ বি৫০ কার্যকর হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
তবুও ইন্দোনেশিয়ার সরকার পিছিয়ে যেতে নারাজ। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও বি৫০ কর্মসূচি বন্ধ হবে না। সরকারের মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং জাতীয় টিকে থাকার প্রশ্ন।
ইন্দোনেশিয়ার বায়োফুয়েল পরিকল্পনা বিশ্ব জ্বালানি নীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তবে এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা এখন নির্ভর করছে উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির ওপর।
ইন্দোনেশিয়ার বি৫০ বায়োফুয়েল পরিকল্পনা বিশ্ব জ্বালানি ও পাম তেলের বাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















