ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্রে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে—বারাক ওবামা কোথায়? এই প্রশ্নের মধ্যে শুধু রাজনৈতিক হতাশা নেই, আছে নেতৃত্বহীনতার গভীর উদ্বেগও। আমেরিকার উদারনৈতিক রাজনীতি যেন এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মানুষ অতীতের কোনো পরিচিত কণ্ঠে আবার আশ্রয় খুঁজতে চাইছে। আর সেই কারণেই সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামাকে ঘিরে প্রত্যাশা থামছে না।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? তিনি কি প্রতিদিনের রাজনৈতিক সংঘর্ষে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, নাকি দূর থেকে মূল্যবোধের লড়াইকে প্রভাবিত করবেন? ওবামার সাম্প্রতিক অবস্থান এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে।
হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় ওবামা বিশ্বাস করেছিলেন, আমেরিকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এত সহজে ভেঙে পড়বে না। ট্রাম্পের উত্থানকে তিনি বিপজ্জনক মনে করলেও ধরে নিয়েছিলেন, রাষ্ট্রের কাঠামো শেষ পর্যন্ত ভারসাম্য রক্ষা করবে। কিন্তু এক দশক পর বাস্তবতা অনেক বেশি কঠোর। ট্রাম্প এখন শুধু একজন বিতর্কিত রাজনীতিক নন; তিনি এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতীক, যেখানে প্রতিষ্ঠান, আইন, নির্বাচন ও রাজনৈতিক শালীনতার প্রচলিত ধারণাগুলো ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তবু ওবামা প্রতিদিন টেলিভিশনে এসে ট্রাম্পবিরোধী ভাষণ দিচ্ছেন না। তিনি নিজেই বলেছেন, যদি তিনি প্রতি সপ্তাহে ট্রাম্পের প্রতিটি বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করেন, তাহলে তিনি আর রাজনৈতিক নেতা থাকবেন না, হয়ে উঠবেন একজন ধারাভাষ্যকার। এই অবস্থান অনেককে হতাশ করে। বিশেষ করে উদারনৈতিক শিবিরের একটি অংশ মনে করে, এমন সংকটকালে ওবামার মতো জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নেতার আরও সরাসরি ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল।

এই হতাশার পেছনে বাস্তব কারণও আছে। ট্রাম্প আমেরিকার রাজনৈতিক ভাষা বদলে দিয়েছেন। ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, বর্ণবাদী ইঙ্গিত, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, বিচারব্যবস্থাকে দলীয় অস্ত্রে পরিণত করার প্রবণতা—এসব এখন আর প্রান্তিক আচরণ নয়। এমন পরিস্থিতিতে ওবামার সংযত কৌশল অনেকের কাছে অপর্যাপ্ত মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
কিন্তু ওবামার দৃষ্টিভঙ্গি অন্য জায়গায়। তিনি বুঝেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুধু বক্তৃতা দিয়ে জনমত বদলানো সম্ভব নয়। মানুষ এখন আর রাজনীতিকে পুরোনো পদ্ধতিতে অনুসরণ করে না; তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পডকাস্ট, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কনটেন্টের ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক ধারণার মুখোমুখি হয়। তাই ওবামাও নিজের প্রভাবকে নতুনভাবে ব্যবহার করছেন। কখনো তরুণ ইনফ্লুয়েন্সারের সঙ্গে আলাপ করছেন, কখনো চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারির মাধ্যমে সামাজিক বার্তা দিচ্ছেন, কখনো তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গড়ে তুলতে কাজ করছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ছিলেন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতীক; কিন্তু সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা নিজেকে দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও প্রজন্মগত লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দেখতে চান। তাঁর লক্ষ্য এখন তাৎক্ষণিক উত্তেজনা নয়, বরং নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা।
এই অবস্থানকে কেউ কেউ বাস্তববাদ বলবেন, আবার কেউ হয়তো বলবেন—এটি সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত সতর্কতা। কারণ ট্রাম্পের রাজনীতি কেবল নির্বাচনী লড়াই নয়; এটি আমেরিকার গণতান্ত্রিক ধারণার ভেতরকার দ্বন্দ্বকে নগ্ন করে দিয়েছে। ফলে অনেকে বিশ্বাস করেন, এই মুহূর্তে নৈতিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও দৃশ্যমান হতে হতো।
তবে ওবামার রাজনৈতিক দর্শন বরাবরই দীর্ঘমেয়াদি। তিনি বিশ্বাস করেন, সমাজের পরিবর্তন ধীরে ঘটে। নাগরিক অধিকার আন্দোলন, নারীর ভোটাধিকার, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম—এসব কোনো একদিনে সফল হয়নি। তাই বর্তমান অস্থিরতাকেও তিনি আমেরিকার দীর্ঘ ইতিহাসের একটি কঠিন অধ্যায় হিসেবে দেখেন, চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে নয়।

এই আশাবাদকে কেউ সরলতা ভাবতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে ওবামার রাজনৈতিক শক্তির মূলেও ছিল এই বিশ্বাস—আমেরিকা তার সংকটের চেয়েও বড়। এমনকি যখন ট্রাম্প তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন, বর্ণবাদী ইঙ্গিত ব্যবহার করেছেন বা ষড়যন্ত্র ছড়িয়েছেন, তখনও ওবামা সচেতনভাবে নিজেকে প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির ভাষা থেকে দূরে রেখেছেন।
এতে রাজনৈতিক লাভ কম হতে পারে, কিন্তু এটি তাঁর নেতৃত্বের ধরনকে ব্যাখ্যা করে। তিনি জনরোষের মুখপাত্র হতে চান না; বরং দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতির পক্ষে দাঁড়াতে চান। সেই কারণেই তিনি তরুণ প্রজন্মকে হতাশা থেকে টেনে বের করতে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় বিপদ ট্রাম্প নন, বরং গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলা।
আজকের আমেরিকায় এই লড়াই শুধু রিপাবলিকান বনাম ডেমোক্র্যাটের নয়। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির লড়াই—ভয় বনাম সহাবস্থান, প্রতিশোধ বনাম প্রতিষ্ঠান, ক্ষণস্থায়ী ক্ষোভ বনাম দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক ধৈর্যের লড়াই।
ওবামা হয়তো প্রতিদিন মঞ্চে নেই। কিন্তু তিনি এখনো সেই বিতর্কের কেন্দ্রেই আছেন, যা নির্ধারণ করবে—আমেরিকা ভবিষ্যতে কেমন রাষ্ট্র হতে চায়।
পিটার স্লেভিন 



















