০৮:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ থেকে জম্মু-কাশ্মীর: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জীবন ও রাজনীতি সিএনএনের জনক টেড টার্নার আর নেই, ২৪ ঘণ্টার সংবাদযুগের পথিকৃৎকে বিদায় বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর সীমান্তে সতর্ক বিজিবি, ‘পুশ-ইন’ ঠেকাতে আগাম প্রস্তুতি বক্স অফিসের নায়ক থেকে তামিল রাজনীতির বিস্ময়, কীভাবে ‘থালাপতি’ বিজয় বদলে দিলেন তামিলনাড়ুর সমীকরণ ক্রেনশর পথ ও “আন্তঃসংযোগ”-এর জন্ম চীনা কোম্পানির বৈশ্বিক আয় রেকর্ডে, শীর্ষে ফক্সকন ও বিওয়াইডি ভারসাম্যের কূটনীতিতে ভারত-ভিয়েতনাম ঘনিষ্ঠতা, সুপারপাওয়ার নির্ভরতা কমানোর বার্তা চিপ জুয়ার ধস: এআই বুমের মাঝেই শেনজেনের ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি ইউয়ান গায়েব মধ্যবিত্ত পৃথিবীর শেষ আশ্রয়: বারো বছরের কিশোরীরা কেন এখনও ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে

পশ্চিমবঙ্গ থেকে জম্মু-কাশ্মীর: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জীবন ও রাজনীতি

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দলীয় সদর দপ্তরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আজ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির আত্মা নিশ্চয়ই শান্তি পেয়েছে।” বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা এই বাঙালি নেতাকে স্মরণ করে মোদি মূলত পশ্চিমবঙ্গে দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার একটি প্রতীকী পরিণতির কথাই তুলে ধরেন। কারণ স্বাধীনতার পর ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম স্থপতি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি।

১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। পরবর্তীতে এই দলই বিবর্তিত হয়ে বিজেপিতে রূপ নেয়। প্রতিষ্ঠার এক বছর পর প্রথম লোকসভা নির্বাচনে জনসংঘ মাত্র তিনটি আসনে জয় পায়, যার মধ্যে দুটি ছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে। পরে ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টির সঙ্গে একীভূত হয়ে দলটি ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু জনতা পার্টির ভাঙনের পর ১৯৮০ সালে বিজেপি গঠিত হয় এবং অটল বিহারি বাজপেয়ী হন নতুন দলের প্রথম সভাপতি। বাজপেয়ী একসময় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও কাজ করেছিলেন।

১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। তাঁর বাবা আশুতোষ মুখার্জি ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি লন্ডনের লিঙ্কনস ইন-এ আইন শিক্ষা নেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা সে সময়ে একটি বিরল অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

রাজনীতিতে তাঁর পথচলা শুরু হয় বঙ্গীয় আইন পরিষদ দিয়ে। ১৯২৯ সালে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে এবং পরে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন। ১৯৪১ সালে এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন সরকারের অর্থমন্ত্রী হন তিনি। মুসলিম লীগের বিরোধিতায় গঠিত এই সরকারে যোগ দেওয়ার ব্যাখ্যায় মুখার্জি বলেছিলেন, সময়ের প্রয়োজনে হিন্দুদের সংগঠিত করা এবং এমন মুসলমানদের সঙ্গে কাজ করা জরুরি, যারা সহযোগিতায় বিশ্বাসী।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত ছিল না। ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর সময় ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে লেখা তাঁর একটি চিঠি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক চলে এসেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, সেই চিঠিতে তিনি আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন।

১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি হিন্দু মহাসভার সভাপতি ছিলেন। দেশভাগের আগে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর “যুক্ত বাংলা” পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। এই পরিকল্পনায় ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একটি স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্রের প্রস্তাব ছিল। মুখার্জির আশঙ্কা ছিল, এতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে হিন্দুরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব হারাবে। ফলে তিনি বাংলাভাগের পক্ষে অবস্থান নেন এবং হিন্দু-অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ করার দাবি জানান।

মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর হিন্দু মহাসভার ভেতরেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটিকে এমন প্রস্তাব গ্রহণে উৎসাহিত করেন, যেখানে গান্ধীর হত্যাকারীর সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্ক থাকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয় এবং সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন জানানো হয়। তবে ১৯৪৮ সালে সংগঠনের সদস্যপদ আরও বিস্তৃত করার তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি হিন্দু মহাসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

Mookerjee and Bengal's Unravelling

১৯৪৯-৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে বিপুলসংখ্যক হিন্দু শরণার্থী ভারতে চলে আসে। সে সময় জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহমন্ত্রী ছিলেন মুখার্জি। শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে তিনি সরব হন। ১৯৫০ সালে নেহরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের মধ্যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু মুখার্জির দাবি ছিল, চুক্তি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট ধারা থাকতে হবে। সেই দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এর পরপরই আরএসএসের সহায়তায় ভারতীয় জনসংঘ গঠন করেন।

কাশ্মীর প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। ১৯৪৭ সালে জম্মু-কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে রাজ্যটিকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। বাইরের মানুষের জন্য সেখানে প্রবেশে পারমিট বাধ্যতামূলক ছিল এবং জমি কেনার অধিকারও সীমাবদ্ধ ছিল। মুখার্জি এই বিশেষ মর্যাদার বিরোধিতা করেন এবং জম্মু-ভিত্তিক প্রজা পরিষদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের বিখ্যাত স্লোগান ছিল, “এক দেশে দুই সংবিধান, দুই প্রধানমন্ত্রী ও দুই পতাকা চলবে না।”

১৯৫২ সালে জনসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণ একীকরণের দাবিকে সমর্থন জানায়। জওহরলাল নেহরু এই আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির বলে মনে করতেন এবং আন্দোলন বন্ধ না হলে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু মুখার্জি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন তাঁর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করছিলেন তরুণ অটল বিহারি বাজপেয়ী। আন্দোলনের সমর্থন বাড়াতে তাঁরা উত্তর ভারতজুড়ে সফর করেন।

১৯৫৩ সালের মে মাসে মুখার্জি পারমিট ছাড়াই জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল রাজ্যের বিশেষ মর্যাদার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতীকী প্রতিবাদ। পাঠানকোট থেকে যাত্রা করে তিনি জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশ করলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের আগে তিনি বাজপেয়ীকে দিল্লিতে ফিরে গিয়ে সবাইকে জানাতে বলেন যে, তিনি বন্দি হিসেবেই হোক, পারমিট ছাড়া কাশ্মীরে প্রবেশ করেছেন।

গ্রেপ্তারের পর শ্রীনগরের কাছে একটি কটেজে তাঁকে আটক রাখা হয়। হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগতে থাকা মুখার্জি বন্দিত্বের পরিস্থিতিতে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। আরএসএস ও জনসংঘপন্থীরা এই ঘটনাকে “কাশ্মীরের পূর্ণ একীকরণের জন্য আত্মবলিদান” হিসেবে তুলে ধরে আসছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গ থেকে জম্মু-কাশ্মীর: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জীবন ও রাজনীতি

পশ্চিমবঙ্গ থেকে জম্মু-কাশ্মীর: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জীবন ও রাজনীতি

০৮:০০:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দলীয় সদর দপ্তরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আজ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির আত্মা নিশ্চয়ই শান্তি পেয়েছে।” বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা এই বাঙালি নেতাকে স্মরণ করে মোদি মূলত পশ্চিমবঙ্গে দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার একটি প্রতীকী পরিণতির কথাই তুলে ধরেন। কারণ স্বাধীনতার পর ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম স্থপতি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি।

১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। পরবর্তীতে এই দলই বিবর্তিত হয়ে বিজেপিতে রূপ নেয়। প্রতিষ্ঠার এক বছর পর প্রথম লোকসভা নির্বাচনে জনসংঘ মাত্র তিনটি আসনে জয় পায়, যার মধ্যে দুটি ছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে। পরে ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টির সঙ্গে একীভূত হয়ে দলটি ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু জনতা পার্টির ভাঙনের পর ১৯৮০ সালে বিজেপি গঠিত হয় এবং অটল বিহারি বাজপেয়ী হন নতুন দলের প্রথম সভাপতি। বাজপেয়ী একসময় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও কাজ করেছিলেন।

১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। তাঁর বাবা আশুতোষ মুখার্জি ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি লন্ডনের লিঙ্কনস ইন-এ আইন শিক্ষা নেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা সে সময়ে একটি বিরল অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

রাজনীতিতে তাঁর পথচলা শুরু হয় বঙ্গীয় আইন পরিষদ দিয়ে। ১৯২৯ সালে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে এবং পরে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন। ১৯৪১ সালে এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন সরকারের অর্থমন্ত্রী হন তিনি। মুসলিম লীগের বিরোধিতায় গঠিত এই সরকারে যোগ দেওয়ার ব্যাখ্যায় মুখার্জি বলেছিলেন, সময়ের প্রয়োজনে হিন্দুদের সংগঠিত করা এবং এমন মুসলমানদের সঙ্গে কাজ করা জরুরি, যারা সহযোগিতায় বিশ্বাসী।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত ছিল না। ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর সময় ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে লেখা তাঁর একটি চিঠি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক চলে এসেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, সেই চিঠিতে তিনি আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন।

১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি হিন্দু মহাসভার সভাপতি ছিলেন। দেশভাগের আগে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর “যুক্ত বাংলা” পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। এই পরিকল্পনায় ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একটি স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্রের প্রস্তাব ছিল। মুখার্জির আশঙ্কা ছিল, এতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে হিন্দুরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব হারাবে। ফলে তিনি বাংলাভাগের পক্ষে অবস্থান নেন এবং হিন্দু-অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ করার দাবি জানান।

মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর হিন্দু মহাসভার ভেতরেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটিকে এমন প্রস্তাব গ্রহণে উৎসাহিত করেন, যেখানে গান্ধীর হত্যাকারীর সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্ক থাকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয় এবং সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন জানানো হয়। তবে ১৯৪৮ সালে সংগঠনের সদস্যপদ আরও বিস্তৃত করার তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি হিন্দু মহাসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

Mookerjee and Bengal's Unravelling

১৯৪৯-৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে বিপুলসংখ্যক হিন্দু শরণার্থী ভারতে চলে আসে। সে সময় জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহমন্ত্রী ছিলেন মুখার্জি। শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে তিনি সরব হন। ১৯৫০ সালে নেহরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের মধ্যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু মুখার্জির দাবি ছিল, চুক্তি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট ধারা থাকতে হবে। সেই দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এর পরপরই আরএসএসের সহায়তায় ভারতীয় জনসংঘ গঠন করেন।

কাশ্মীর প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। ১৯৪৭ সালে জম্মু-কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে রাজ্যটিকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। বাইরের মানুষের জন্য সেখানে প্রবেশে পারমিট বাধ্যতামূলক ছিল এবং জমি কেনার অধিকারও সীমাবদ্ধ ছিল। মুখার্জি এই বিশেষ মর্যাদার বিরোধিতা করেন এবং জম্মু-ভিত্তিক প্রজা পরিষদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের বিখ্যাত স্লোগান ছিল, “এক দেশে দুই সংবিধান, দুই প্রধানমন্ত্রী ও দুই পতাকা চলবে না।”

১৯৫২ সালে জনসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণ একীকরণের দাবিকে সমর্থন জানায়। জওহরলাল নেহরু এই আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির বলে মনে করতেন এবং আন্দোলন বন্ধ না হলে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু মুখার্জি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন তাঁর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করছিলেন তরুণ অটল বিহারি বাজপেয়ী। আন্দোলনের সমর্থন বাড়াতে তাঁরা উত্তর ভারতজুড়ে সফর করেন।

১৯৫৩ সালের মে মাসে মুখার্জি পারমিট ছাড়াই জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল রাজ্যের বিশেষ মর্যাদার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতীকী প্রতিবাদ। পাঠানকোট থেকে যাত্রা করে তিনি জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশ করলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের আগে তিনি বাজপেয়ীকে দিল্লিতে ফিরে গিয়ে সবাইকে জানাতে বলেন যে, তিনি বন্দি হিসেবেই হোক, পারমিট ছাড়া কাশ্মীরে প্রবেশ করেছেন।

গ্রেপ্তারের পর শ্রীনগরের কাছে একটি কটেজে তাঁকে আটক রাখা হয়। হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগতে থাকা মুখার্জি বন্দিত্বের পরিস্থিতিতে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। আরএসএস ও জনসংঘপন্থীরা এই ঘটনাকে “কাশ্মীরের পূর্ণ একীকরণের জন্য আত্মবলিদান” হিসেবে তুলে ধরে আসছে।