ইউরোপজুড়ে বাড়তে থাকা ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে আলোচনায় সাধারণত নিরাপত্তা, অনলাইন ঘৃণা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবকে সামনে আনা হয়। কিন্তু ব্রিটেনে এখন যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রতিধ্বনি নয়; এটি ব্রিটিশ সমাজের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্নটি এখন আর কেবল ইহুদিদের নিরাপত্তা নিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্র কতটা সফলভাবে তার নাগরিক পরিচয়, সামাজিক চুক্তি এবং সাংস্কৃতিক ভারসাম্য ধরে রাখতে পেরেছে—সেই প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে।
গত কয়েক দশকে ব্রিটেন নিজেকে একটি বহুসাংস্কৃতিক উদার সমাজ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে। কিন্তু সেই প্রকল্পের ভেতরে একটি মৌলিক দুর্বলতা ছিল—রাষ্ট্র ধরে নিয়েছিল, ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই একটি সাধারণ নাগরিক মূল্যবোধের দিকে এগোবে। বাস্তবতা দেখাচ্ছে, সেই ধারণা সবক্ষেত্রে সত্য হয়নি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক রাজনৈতিক ক্ষোভ, ধর্মীয় উগ্রতা এবং পশ্চিমবিরোধী মনোভাবের একটি অংশ অভিবাসনের মাধ্যমে ইউরোপীয় সমাজে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।
এটি বলা গুরুত্বপূর্ণ যে মুসলিম সমাজ একরৈখিক নয়। কোটি কোটি মুসলমান শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করেন এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সংযুক্ত। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করা কঠিন যে ব্রিটেনে ইহুদিবিদ্বেষের একটি বড় অংশ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটিশ মুসলিমদের একটি অংশের মধ্যে ইহুদিদের নিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক ধারণা, হামাসের প্রতি সহানুভূতি কিংবা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে নিজেদের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি।

এই প্রবণতা কেবল মতামতের ভিন্নতা নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা সরাসরি সামাজিক বিদ্বেষে রূপ নিচ্ছে। “গ্লোবালাইজ দ্য ইনতিফাদা” ধরনের স্লোগান পশ্চিমা রাজনৈতিক ভাষ্যে কেউ কেউ প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, বাস্তবে এটি সহিংসতার আন্তর্জাতিকীকরণের আহ্বান হিসেবেই বহু মানুষের কাছে ধরা পড়ে। যখন রাস্তায় ইহুদি উপাসনালয় ঘিরে হুমকি তৈরি হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইহুদি শিক্ষার্থীরা আতঙ্ক অনুভব করে, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে—তখন বিষয়টি আর কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন থাকে না।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বিধা। ব্রিটিশ রাজনীতি বহু বছর ধরে ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে সরাসরি কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেছে। কারণ, এমন আলোচনায় ইসলামবিদ্বেষের অভিযোগ ওঠার আশঙ্কা থাকে। ফলে একধরনের নীরবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে উগ্র মতাদর্শের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বদলে সবাই ভাষা বেছে নিতে ব্যস্ত থেকেছে। কিন্তু এই শূন্যতাই চরমপন্থী প্রচারণাকে আরও জায়গা করে দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমাধান কোথায়? পশ্চিমা উদার গণতন্ত্রের প্রচলিত কাঠামো কি এই নতুন বাস্তবতার জন্য যথেষ্ট? অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ—যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো বা জর্ডান—ধর্মীয় বক্তৃতা, মসজিদ পরিচালনা এবং ইমামদের কার্যক্রমের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে উগ্রবাদ মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। পশ্চিমা সমাজে এ ধরনের ব্যবস্থা বিতর্কিত, কারণ তা ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে সম্পূর্ণ উদার ও নিয়ন্ত্রণহীন মডেলও সবসময় কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

ব্রিটেনের সামনে তাই কঠিন এক বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রকে হয়তো নতুন ধরনের নীতিগত কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখেও সহিংস মতাদর্শের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হবে। শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে চলবে না; ঘৃণা উৎপাদনের নেটওয়ার্ক, অর্থায়ন, ধর্মীয় উসকানি এবং সাংগঠনিক প্রচারণাকেও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ইহুদিদের ব্রিটিশ সমাজে উপস্থিতি কোনো নতুন বিষয় নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা ব্রিটিশ সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের অংশ। তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার বদলে, বরং সেই মতাদর্শগুলোকেই চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন, যেগুলো সহাবস্থানকে দুর্বল করে এবং ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সংঘর্ষের অস্ত্রে পরিণত করে।
ইউরোপের বর্তমান সংকট আসলে কেবল ইহুদিবিদ্বেষের সংকট নয়; এটি উদার সমাজের আত্মরক্ষার সক্ষমতারও পরীক্ষা।
জুলিয়েট স্যামুয়েল 



















