ভারতের প্রতিবেশী নীতিতে নিরাপত্তা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে মন্তব্য করেছেন দিল্লিভিত্তিক কৌশল ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাটস্ট্র্যাটের কনভেনর পঙ্কজ সরণ। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন অধ্যায় শুরু করতে আগ্রহী ভারত।
পঙ্কজ সরণ বলেন, “বাংলাদেশের নতুন সরকার কীভাবে চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করবে এবং সেখানে ভারতের অবস্থান কোথায় হবে, সেটি আমাদের দেখতে হবে।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সচিবালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে বিভিন্ন ভারতীয় মিশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা এই বিশেষজ্ঞ বলেন, একদিকে ভারত নিজের নিরাপত্তা স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়, অন্যদিকে পাকিস্তান বাদে প্রতিবেশী অঞ্চলে ইতিবাচক নীতি অনুসরণেরও চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, “চীনের সীমান্ত আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত। তাই এসব দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।”
চল্লিশ বছরের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক এই ভারতীয় কূটনীতিক ঢাকাগামী এক গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সুশমা স্বরাজ ইনস্টিটিউটে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন। আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে ন্যাটস্ট্র্যাটের উপদেষ্টা শান্তনু মুখার্জি, ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক এমরুল কায়েশ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদল ৩ থেকে ৯ মে পর্যন্ত এক সপ্তাহের সফরে ভারতে অবস্থান করছে।
পঙ্কজ সরণ বলেন, বর্তমান বিশ্ব একটি কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়া এখনো চরম বৈরিতা ও নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পৌঁছায়নি, সেটাই ইতিবাচক দিক।
তিনি বলেন, “আমাদের উচিত ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়াকে শেখানো—ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একসঙ্গে বসবাস করা যায়।”
আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও মিয়ানমার বর্তমানে নানা সংকটে রয়েছে। তবে নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে গণতন্ত্রের বিকাশ নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
তার ভাষায়, “এই চার দেশে নতুন নেতৃত্ব এসেছে এবং তারা রাজনৈতিক জীবনের নতুন যাত্রা শুরু করছে।”
-69fdcd29c9483.jpg)
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে কার্যত কোনো যোগাযোগ নেই। কূটনৈতিক সম্পর্কও স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
মিয়ানমারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ভাঙনের কারণে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে পঙ্কজ সরণ বলেন, নির্বাচনের পরদিনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। পরদিন তারেক রহমানও সামাজিক মাধ্যমে সেই বার্তার জবাব দেন।
তিনি বলেন, “ইউনূস সরকারের সময়কার সম্পর্কের পরিবেশ থেকে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।”
পঙ্কজ সরণ জানান, ভারত খুব দ্রুত নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে নির্বাচনের ফলও স্বীকৃতি দিয়েছে।
তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা ছিল তাৎক্ষণিক, বন্ধুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক। দুই নেতার মধ্যে ফোনালাপও হয়েছে, যা নতুন ধরনের সম্পর্ক গঠনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর নাম ঘোষণা করেছে বলেও জানান তিনি। ১৯৭১ সালের পর এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
পঙ্কজ সরণ বলেন, “এর অর্থ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে এমন কাউকে পাঠাতে চান, যিনি তার পূর্ণ আস্থাভাজন এবং বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক পরিবেশ বুঝে কাজ করতে সক্ষম।”
তিনি আরও বলেন, “সম্পর্ক এখন ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। তবে দিল্লি বা ঢাকায় যে-ই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ইতিহাস, ভূগোল ও সংস্কৃতির বাস্তবতা কখনো বদলানো যাবে না।”
অতীতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক প্রায় ভেঙে পড়েছিল।
তিনি বলেন, “তখন ভারত অভিযোগ তুলত, বাংলাদেশ তা অস্বীকার করত। ফলে সংলাপ বন্ধ হয়ে যায়, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং যৌথ উদ্যোগও এগোতে পারেনি।”
ইউএনবি 



















