আটলান্টিক মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাগরস্রোত ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, শতাব্দীর শেষ নাগাদ এই স্রোতব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আর তার প্রভাব পড়তে পারে ইউরোপ থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আবহাওয়া, কৃষি এবং জলবায়ু ব্যবস্থায়।
বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে নজর দিচ্ছেন অ্যাটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন বা এএমওসি নামের বিশাল সাগরস্রোত ব্যবস্থার দিকে। পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এটি অন্যতম বড় ভূমিকা পালন করে। নতুন গবেষণায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২১০০ সালের মধ্যে এই স্রোতের শক্তি প্রায় ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
পৃথিবীর অদৃশ্য ‘কনভেয়র বেল্ট’
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, পৃথিবীর সমুদ্রগুলো যেন একটি বিশাল অদৃশ্য কনভেয়র বেল্টের মাধ্যমে সংযুক্ত। আটলান্টিক মহাসাগরে এই ব্যবস্থাটিই এএমওসি নামে পরিচিত।
ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ ও লবণাক্ত পানি উত্তরের দিকে গ্রিনল্যান্ড পর্যন্ত প্রবাহিত হয়। সেখানে পৌঁছে ঠান্ডা হয়ে পানি ঘন হয়ে গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যায়। এরপর সেই ঠান্ডা পানি আবার দক্ষিণমুখী গভীর স্রোত হিসেবে প্রবাহিত হয় এবং পরে ভূপৃষ্ঠে উঠে উষ্ণ হয়ে আবার একই চক্র শুরু করে।
এই ধীর কিন্তু বিশাল প্রক্রিয়া পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপ ছড়িয়ে দেয়। ইউরোপের তুলনামূলক মৃদু আবহাওয়ার পেছনেও এই স্রোতের বড় ভূমিকা রয়েছে। একইসঙ্গে আফ্রিকা, আমেরিকা এবং এশিয়ার বৃষ্টিপাতের ধরণও এটি প্রভাবিত করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা
এই সাগরস্রোত টিকে আছে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর। কিন্তু মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুত গলছে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ। এর ফলে বিপুল পরিমাণ মিঠাপানি উত্তর আটলান্টিকে মিশছে।
মিঠাপানি তুলনামূলক হালকা এবং কম লবণাক্ত হওয়ায় তা সহজে সমুদ্রের গভীরে ডুবে যেতে পারে না। ফলে পুরো এএমওসি ব্যবস্থার গতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
আগের গবেষণাগুলোতে গত ৫০ বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ দুর্বল হওয়ার কথা বলা হলেও, নতুন গবেষণায় আরও বড় পতনের আশঙ্কা করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি একটি ‘ক্লাইমেট টিপিং পয়েন্ট’ বা জলবায়ুর বিপজ্জনক সীমা। একবার এই সীমা অতিক্রম করলে সাগরস্রোত স্থায়ীভাবে ভেঙে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে উত্তর আমেরিকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়তে পারে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।

এল নিনোর আচরণেও অস্থিরতা
আটলান্টিকের এই পরিবর্তনের প্রভাব প্রশান্ত মহাসাগরেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে এল নিনো ঘটনাগুলো আরও অস্থির ও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া ঘটনা, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে। ২০১৫-১৬ এবং ২০২৩-২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময় বিশ্বের নানা দেশে খরা, অতিবৃষ্টি ও কৃষি সংকট দেখা গিয়েছিল।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এএমওসি দুর্বল হলে পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের তাপমাত্রার ভারসাম্য বদলে যাবে। এর ফলে এল নিনোর ধরণও আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের জন্য কেন বড় সতর্কবার্তা
ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি শুধু একটি দূরবর্তী সমুদ্রঘটনা নয়, বরং সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষির জন্য বড় হুমকি।
ভারতের গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বৃষ্টি নির্ভর করে বৈশ্বিক তাপবণ্টনের ওপর। আটলান্টিকের স্রোত দুর্বল হয়ে পড়লে উত্তর দিকে কম তাপ পৌঁছাবে। এর প্রভাবে পৃথিবীর ক্রান্তীয় বৃষ্টিপাত বলয় দক্ষিণ দিকে সরে যেতে পারে, যা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বর্ষাকে দূরে ঠেলে দিতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এতে আরব সাগর থেকে ভারতে আর্দ্রতা বহনকারী বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে বর্ষাকাল ছোট হয়ে যেতে পারে, শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘ হতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে শুষ্কতার প্রবণতা বাড়তে পারে।
একইসঙ্গে অনিয়মিত ও তীব্র এল নিনো পরিস্থিতি ভারতীয় কৃষকদের আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলবে। কখনও তীব্র খরা, কখনও হঠাৎ বন্যা—এই দুই চরম পরিস্থিতির মধ্যে আটকে পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি ব্যবস্থা।
আটলান্টিক সাগরস্রোতের দুর্বলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ, যা ভারতের বর্ষা ও বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















