জন্মের পরই মায়ের পরিত্যাগ, একাকিত্ব আর দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম—সবকিছু মিলিয়ে জাপানের এক ছোট্ট চিড়িয়াখানার বানরশিশু এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মাত্র ৯ মাস বয়সী জাপানি ম্যাকাক ‘পাঞ্চ’ এখন শুধু একটি প্রাণী নয়, অনেক মানুষের কাছে সে হয়ে উঠেছে সাহস আর টিকে থাকার প্রতীক।
টোকিওর উপকণ্ঠে অবস্থিত ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানায় প্রতিদিন এখন হাজারো মানুষ ভিড় করছেন শুধু পাঞ্চকে এক ঝলক দেখার জন্য। চিড়িয়াখানার কর্মীরা বলছেন, কয়েক মাস আগেও যে জায়গাটি দর্শক টানতে হিমশিম খেত, এখন সেখানে মানুষের ঢল নামছে।
মায়ের স্নেহহীন শৈশব
গত বছরের জুলাইয়ে তীব্র গরমের সময় কঠিন প্রসবের পর পাঞ্চকে তার মা পরিত্যাগ করে বলে জানায় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। ছোট্ট বানরটি তখন আশ্রয় খুঁজে পায় একটি খেলনা ওরাংওটানের কাছে। সেই খেলনাকে জড়িয়ে ধরে থাকার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায় পাঞ্চ।

জানুয়ারিতে তাকে আবার বানরদলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলেও শুরুতে সে বেশ একা হয়ে পড়ে। অন্যদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সময় লাগে তার। প্রায়ই তাকে একা খেলতে দেখা যেত। তবে ধীরে ধীরে এখন সে দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছে।
দর্শকদের ভালোবাসায় বদলে গেছে চিড়িয়াখানা
পাঞ্চকে ঘিরে এখন তৈরি হয়েছে এক বিশাল ভক্তগোষ্ঠী। ‘টিম পাঞ্চ’ লেখা টি-শার্ট, স্টিকার, খেলনা—সবকিছুতেই তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি যে খেলনা ওরাংওটানটিকে সে আঁকড়ে ধরত, সেটিও বাজারে শেষ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
চিড়িয়াখানায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে চিঠি, আঁকা ছবি আর শুভেচ্ছা বার্তা। কেউ কেউ দূর শহর থেকে রাতভর বাসে চড়ে শুধু পাঞ্চকে দেখতে আসছেন। দর্শকদের অনেকে বলছেন, যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি বা দৈনন্দিন দুশ্চিন্তার সময় পাঞ্চ তাদের মনে কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়।
এক দর্শনার্থী জানান, পাঞ্চকে দেখলে জীবনের কঠিন বাস্তবতা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকা যায়। আরেকজন বলেন, “ও কখনও হার মানেনি। সেটাই সবচেয়ে অনুপ্রেরণার।”
সমালোচনাও কম নয়

তবে পাঞ্চের জনপ্রিয়তার সঙ্গে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, বড় বানররা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বা আঘাত করছে। এতে প্রাণী অধিকারকর্মীদের একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
কিছু সংগঠন দাবি করেছে, পাঞ্চকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করা উচিত। যদিও চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, বানরদলের ভেতরের আচরণ এবং ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝা জরুরি। তাদের দাবি, পাঞ্চকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতেই তারা কাজ করছে।
চিড়িয়াখানার নতুন আশার নাম
পাঞ্চের জনপ্রিয়তা ইচিকাওয়া সিটি চিড়িয়াখানার আর্থিক অবস্থাও বদলে দিয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অনুদান পেয়েছে। দর্শনার্থীর সংখ্যাও প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
পাঞ্চের দেখাশোনাকারী এক কর্মী জানান, এখনো খাবারের সময় পাঞ্চ তার হাত শক্ত করে ধরে থাকে। তবে তিনি চান, একদিন পাঞ্চ পুরোপুরি নিজের দলের সঙ্গেই স্বাভাবিকভাবে জীবন কাটাক।
তার কথায়, “পাঞ্চ অনেক বদলে গেছে। আমি চাই, একদিন সে আমাকে ভুলে যাক, আর নিজের জীবন নিয়ে এগিয়ে যাক।”



সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















