ইরান যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন করে সামনে এসেছে ইসরায়েল প্রশ্ন। বিশেষ করে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে এই ইস্যু এখন বড় ধরনের বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত রিপাবলিকানদের মধ্যেই এখন তৈরি হয়েছে তীব্র মতভেদ। একদল ইসরায়েলের পক্ষে আগের মতোই শক্ত অবস্থানে থাকলেও আরেকদল প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছে, কেন আমেরিকাকে অন্য দেশের জন্য যুদ্ধ করতে হবে।
ফ্লোরিডার রাজনীতিতে এই পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সেখানে গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এক রিপাবলিকান প্রার্থী প্রচারণায় এমন টি-শার্ট বিক্রি করছেন, যাতে লেখা— “ইসরায়েলের জন্য কোনো আমেরিকানের মৃত্যু হওয়া উচিত নয়।” অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী আলোচিত মুখ লরা লুমার নতুন একটি প্রচারমাধ্যম চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যার মূল লক্ষ্য হবে ইসরায়েলবিরোধী ডানপন্থী কণ্ঠগুলোকে আক্রমণ করা।
নতুন বিভাজনের কেন্দ্রবিন্দু
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে পররাষ্ট্রনীতি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে না। কিন্তু ইরান যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। রিপাবলিকানদের ভেতরে এখন ইসরায়েলকে ঘিরে প্রকাশ্য বিতর্ক চলছে। বিশেষ করে তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যে ইসরায়েল নিয়ে আগের মতো সমর্থন আর দেখা যাচ্ছে না।

লরা লুমার দাবি করেছেন, রিপাবলিকানদের একাংশের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান এখন “অস্বাভাবিক মাত্রায়” পৌঁছেছে। তিনি ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের “সবচেয়ে বড় মিত্র” হিসেবে উল্লেখ করে সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। একইসঙ্গে তিনি এমন একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশ করতে চান, যেখানে ইসরায়েলবিরোধী ডানপন্থী ভাষ্যকারদের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক আক্রমণ চালানো হবে।
তরুণ রিপাবলিকানদের বদলে যাওয়া মনোভাব
সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, রিপাবলিকান পার্টির তরুণ সমর্থকদের মধ্যে ইসরায়েল নিয়ে আগের উচ্ছ্বাস কমছে। বিশেষ করে ৫০ বছরের নিচের রিপাবলিকানদের বড় অংশ এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। অন্যদিকে বয়স্ক রিপাবলিকানদের মধ্যে এখনও ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন রয়েছে।
ফ্লোরিডার রিপাবলিকান নেতা চেজ ট্রামন্ট এই পরিবর্তনকে “অবিশ্বাস্য” বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, তরুণ ডানপন্থীদের অনেকেই এখন এমন কথা বলছেন, যা আগে মূলত বামপন্থীদের কাছ থেকে শোনা যেত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল সমর্থনকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ইরান যুদ্ধ ও ক্ষোভ
ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা অনেক রিপাবলিকান ভোটারের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। জনপ্রিয় ডানপন্থী ভাষ্যকার টাকার কার্লসন প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে নিয়েছে। তাঁর ভাষায়, বিদেশি স্বার্থের কারণে আমেরিকার নীতিনির্ধারণ প্রভাবিত হচ্ছে।

এই অবস্থান তরুণ রিপাবলিকানদের একাংশের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ফ্লোরিডার প্রার্থী জেমস ফিশব্যাকও সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। নির্বাচনী সমাবেশে তিনি বলেছেন, আমেরিকার অর্থ বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে দেশের স্বার্থে ব্যয় করা উচিত। এমনকি ফ্লোরিডার সরকারি বিনিয়োগ থেকে ইসরায়েলি বন্ড সরিয়ে নেওয়ারও দাবি তুলেছেন তিনি।
পুরোনো বনাম নতুন রিপাবলিকান রাজনীতি
এই বিতর্ক এখন রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে প্রজন্মগত দ্বন্দ্বও তৈরি করেছে। বয়স্ক ও ধর্মভিত্তিক ভোটারদের বড় অংশ এখনও ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখেন। কিন্তু তরুণ ভোটারদের একাংশ মনে করছেন, “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির সঙ্গে বিদেশি যুদ্ধ বা অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা সাংঘর্ষিক।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মতবিরোধ আগামী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ দলটির ভেতরে এখন স্পষ্টভাবে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়েছে— একদিকে ঐতিহ্যগত প্রো-ইসরায়েল অবস্থান, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নতুন ধারা।
লরা লুমার নিজেও স্বীকার করেছেন, জনমতের এই পরিবর্তন থামানো সহজ হবে না। এমনকি তিনি দাবি করেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি ব্যক্তিগত আলোচনায় বলেছেন, তিনি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের “শেষ প্রো-ইসরায়েল প্রেসিডেন্ট” হতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রাজনীতিতে ইসরায়েল প্রশ্ন এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে আদর্শিক পরিচয়ের লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















