ইরানের যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি গিয়ে পড়েছে তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের জীবনে। প্লাস্টিকের কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশটিতে প্লাস্টিকজাত পণ্যের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাজারে বাড়ছে প্লাস্টিক ব্যাগ, খাবারের প্যাকেট, ওষুধের মোড়কসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রীর দাম।
বিশ্বের অন্যতম বেশি প্লাস্টিক ব্যবহারকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত তাইওয়ানে এই সংকট এখন ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ ক্রেতা—সবাইকে চাপে ফেলেছে। প্রতিদিন কোটি কোটি প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারের অভ্যাস থাকা দেশটিতে এখন ছোট দোকানদাররাও বাধ্য হচ্ছেন বাড়তি দাম নিতে।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা
তাইওয়ানের বড় প্লাস্টিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে ন্যাফথা আমদানি করে আসছে। এই ন্যাফথা থেকেই তৈরি হয় প্লাস্টিকের প্রধান কাঁচামাল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগর হয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মার্চ মাসের শুরু থেকেই সরবরাহ কমতে শুরু করে।

তাইওয়ানের অন্যতম বড় জ্বালানি ও প্লাস্টিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ফরমোসা পেট্রোকেমিক্যাল তাদের দুটি উৎপাদন লাইনের একটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪২ শতাংশ কমে গেছে বলে জানা গেছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বা মহামারির সময়ও এমন সংকট দেখা যায়নি। বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা হলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না।
বাজারে বাড়ছে দাম
রাজধানী তাইপের ঐতিহ্যবাহী শিজৌ বাজারে এখন সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। খাবারের দোকান, সবজি বিক্রেতা, ওষুধের দোকান—সবখানেই প্লাস্টিকের ব্যবহার অপরিহার্য। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে প্লাস্টিক ব্যাগ ও খাবারের প্যাকেটের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
অনেক ব্যবসায়ী এখনও ক্রেতাদের ওপর পুরো চাপ চাপিয়ে দিতে চাইছেন না। কারণ তাদের অনেক ক্রেতাই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত মানুষ। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না বলেও তারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
একজন খাবার ব্যবসায়ী জানান, যুদ্ধ শুরুর পর কিছু সরবরাহকারী প্লাস্টিক ব্যাগের দাম তিন গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে আগের দামে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

ফার্মেসিতেও সংকট
শুধু খাবারের দোকান নয়, সংকট পৌঁছে গেছে ফার্মেসিতেও। তাইপের এক ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, তিনি বহু বছর ধরে নিজের দোকানের নামে ছাপানো বিশেষ প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করে আসছেন। কিন্তু মার্চে নতুন অর্ডার দেওয়ার পর সরবরাহকারী জানিয়ে দেয়, কবে পণ্য পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েই তার মজুত শেষ হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে কাগজের ব্যাগ ব্যবহার শুরু করেন। তবে সেগুলোর ভেতরেও প্লাস্টিকের আবরণ থাকায় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তিনি বলেন, এত সাধারণ জিনিস যে দৈনন্দিন জীবনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ, তা আগে কেউ ভাবেনি।
পরিবেশ বিতর্কও সামনে
তাইওয়ানে প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশবিদদের উদ্বেগের কারণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে প্রায় ৫০ বিলিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার কারণে মানুষ প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ে খুব একটা অপরাধবোধ অনুভব করেন না। ফলে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরতা বেড়েই চলেছে।
বর্তমান সংকট তাইওয়ানের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তাও হয়ে উঠেছে। কারণ যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকট কীভাবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে, সেটি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















