ফ্রান্সের ছোট ছোট গ্রামগুলোতে শত বছরের পুরোনো গির্জাগুলো শুধু ধর্মীয় উপাসনার জায়গা নয়, বরং স্থানীয় মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর পরিচয়ের অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসব গির্জায় ধারাবাহিক চুরির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে। বিশেষ করে উত্তর ফ্রান্সের গ্রামীণ এলাকায় একের পর এক গির্জা লুটের ঘটনা দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
গত বছরের জুলাই মাসে ফ্রান্সের বুরেল গ্রামের একটি পুরোনো ক্যাথলিক গির্জায় হামলা চালায় দুই চোর। তারা দানের বাক্স ভেঙে ফেলে, গির্জার ভেতরের কক্ষের দরজা ভেঙে ঢুকে ধর্মীয় নানা মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যায়। একই দিনে পাশের আরেকটি গ্রামের গির্জা থেকেও একটি মূল্যবান পাত্র চুরি হয়। পরদিন আরও একটি গির্জায় হামলা চালানো হয়। পরে তদন্তে উঠে আসে, মাত্র তিন মাসে উত্তর ফ্রান্সের ২৯টি গির্জায় চুরির সঙ্গে জড়িত ছিল একই জুটি।

গ্রামাঞ্চলের নিঃসঙ্গ বাস্তবতা
ফ্রান্সের অনেক গ্রামে এখন আর আগের মতো মানুষ থাকে না। তরুণরা পড়াশোনা বা কাজের জন্য শহরে চলে যায় এবং অনেকেই আর ফিরে আসে না। ফলে গ্রামের দোকান, ক্যাফে বা সামাজিক কেন্দ্রগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় গির্জাগুলোই হয়ে উঠেছে গ্রামের শেষ পরিচয়চিহ্ন। বুরেল গ্রামের মেয়র ডেমিয়েন ইভারনো বলেন, গ্রামের গির্জাটিই এখন তাদের গর্ব এবং অস্তিত্বের প্রতীক।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা এসব গির্জার দেখভাল করেন। কোথাও কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় চোরদের জন্য এগুলো সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠছে। অনেক গির্জা সপ্তাহে মাত্র এক-দুদিন খোলা থাকে। কোথাও কোথাও বছরে হাতে গোনা কয়েকবার প্রার্থনা হয়। ফলে চুরির ঘটনা ঘটলেও তা অনেক সময় কয়েকদিন পর জানা যায়।
সহজ কৌশলে বড় চুরি

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা গির্জাগুলোর তথ্য আগে অনলাইনে খুঁজে দেখত। তারপর সুযোগ বুঝে সাধারণ লোহার রড দিয়ে দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ত। কখনও তারা সপ্তাহান্তের ভ্রমণের অজুহাতে বিভিন্ন এলাকায় যেত এবং সেখানকার গির্জাগুলোকে লক্ষ্য করত।
চুরি হওয়া কিছু সামগ্রী স্থানীয় পুরোনো জিনিসের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। কিছু গলিয়ে ধাতু হিসেবে বিক্রি করা হয় প্যারিসে। আবার অনেক সামগ্রী নিজেদের বাড়িতেই সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের বাড়ি থেকে বহু ধর্মীয় সামগ্রী উদ্ধার করে।
হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের খোঁজ
তদন্তের সময় সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল গির্জাগুলোর কাছে বিস্তারিত তালিকা না থাকা। ফলে উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর প্রকৃত মালিকানা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পুরোহিত ও মেয়র উদ্ধার হওয়া জিনিসগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি।

ডিসেম্বরে হওয়া আদালতের শুনানিতে অভিযুক্তরা হাজির হয়নি। পরে তারা ক্ষমা চেয়ে চিঠি পাঠালেও ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই তা দেখেননি বলে জানান। আদালত শেষ পর্যন্ত দুই অভিযুক্তকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়, যার মধ্যে দুই বছর স্থগিত রাখা হয়েছে। বাকি সময় তারা নজরদারির মধ্যে কাটাবে।
স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা বলছেন, এসব গির্জা শুধু স্থাপনা নয়, বরং মানুষের স্মৃতি ও বিশ্বাসের অংশ। সেখানে রাখা ছোট ছোট মূর্তি, পুরোনো শিল্পকর্ম বা ধর্মীয় সামগ্রী বহু মানুষের প্রার্থনা ও ইতিহাস বহন করে। এসব হারিয়ে গেলে গ্রামের আত্মপরিচয়ের একটি অংশও হারিয়ে যায়।
ফ্রান্সের গ্রামীণ সমাজে তাই এখন শুধু চুরি নয়, নিজেদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার উদ্বেগও বাড়ছে।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















