বাংলাদেশের প্রথম তেলক্ষেত্র হিসেবে ১৯৮৬ সালে সিলেটের হারিপুরে তেলের সন্ধান মিলেছিল। পরের বছর থেকেই সেখানে বাণিজ্যিকভাবে তেল উত্তোলন শুরু করে পেট্রোবাংলা। টানা সাত বছরে প্রায় ৫ লাখ ৪২ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করা হয়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, উৎপাদন আর লাভজনক ছিল না। তবে তিন দশক পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে—সত্যিই কি হারিপুরের তেল শেষ হয়ে গিয়েছিল, নাকি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনাই বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশের একমাত্র তেলক্ষেত্রকে?
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ বলছেন, হারিপুরে আধুনিক তেল উত্তোলন প্রযুক্তি কখনও প্রয়োগই করা হয়নি। ফলে বিপুল পরিমাণ তেল এখনও মাটির নিচে থেকে যেতে পারে।

প্রযুক্তির অভাব নাকি অব্যবস্থাপনা
পেট্রোবাংলা, বাপেক্স ও বিইআরসিতে দায়িত্ব পালন করা ভূতত্ত্ববিদ মকবুল ই এলাহী চৌধুরী বলেন, হারিপুরে তেল উত্তোলন বন্ধ হওয়ার কারণ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কোনো বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন কখনও প্রকাশ হয়নি। তার মতে, কোনো কূপ পরিত্যক্ত ঘোষণার আগে বিশদ পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ জরুরি ছিল, কিন্তু হারিপুরের ক্ষেত্রে সেটি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতে কূপের স্বাভাবিক চাপেই তেল উঠে আসে। সময়ের সঙ্গে চাপ কমে গেলে কৃত্রিম উত্তোলন ব্যবস্থা, যেমন রড পাম্প বা সেকেন্ডারি রিকভারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের প্রায় সব তেল উৎপাদনকারী দেশই এই পদ্ধতি ব্যবহার করে দীর্ঘদিন উৎপাদন চালিয়ে যায়। কিন্তু হারিপুরে এসব প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়নি।
তাদের দাবি, কূপে পানি প্রবেশের পর নতুন কূপ খনন বা চাপ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিলে উৎপাদন আরও দীর্ঘ সময় ধরে চালানো যেত।
মাটির নিচে কি এখনও তেল আছে?

বিভিন্ন গবেষণা ও পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, হারিপুরে সম্ভাব্য মজুত ছিল প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল। অথচ সাত বছরে উত্তোলন হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ব্যারেলের কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল এখনও ভূগর্ভে রয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের তথ্যে দেখা যায়, একসময় হারিপুরে দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ ব্যারেল পর্যন্ত তেল উৎপাদন হতো। পরে উৎপাদন কমে ১০০ ব্যারেলে নেমে এলে কূপটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া মনে করেন, কূপে পানি ঢোকার পরও নতুন কূপ খননের সুযোগ ছিল। তার মতে, হারিপুরে তেলের উপস্থিতির ধারাবাহিকতা ছিল এবং অন্য স্তরেও তেলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। ফলে সেখানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানের সুযোগ এখনও রয়েছে।
নতুন তেল আবিষ্কার, কিন্তু উৎপাদন শুরু হয়নি
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পেট্রোবাংলা আবারও হারিপুর কাঠামোয় তেলের সন্ধান পাওয়ার ঘোষণা দেয়। সিলেট-১০ কূপে ১ হাজার ৩৯৭ থেকে ১ হাজার ৪৪৫ মিটার গভীরে তেল পাওয়া যায় বলে জানানো হয়। তখন প্রতিদিন প্রায় ৩৫ ব্যারেল তেল প্রবাহের তথ্যও দেওয়া হয়েছিল। এটিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বীকৃত তেলক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তবে আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি। পেট্রোবাংলা বলছে, জমি-সংক্রান্ত জটিলতা কাটলে পাইপলাইন নির্মাণ শেষ করে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
গ্যাসের খোঁজে তেল উপেক্ষা?
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরেই এমন প্রবণতা রয়েছে যে একটি স্তরে গ্যাস পাওয়া গেলে বাকি স্তরগুলোর অনুসন্ধান আর এগোয় না। তার মতে, হারিপুরের যেসব স্তরে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন ছিল, সেগুলো কখনও গুরুত্ব পায়নি।
বর্তমানে হারিপুর ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড নতুন কূপ খননের কাজও চালাচ্ছে। তবে পরিত্যক্ত তেলক্ষেত্রটি পুনরায় উন্নয়নের বিষয়ে এখনও সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই।
জ্বালানি সংকটের এই সময়ে দেশীয় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম তেলক্ষেত্র হারিপুরের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















