০৩:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
ইসরায়েল ইস্যুতে বিভক্ত আমেরিকার কট্টর ডানপন্থী শিবির, রিপাবলিকান রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় তাইওয়ানে প্লাস্টিক সংকট, বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলের গির্জায় চুরির হানা, হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্য স্টারমারের সংকট: নেতৃত্বের প্রশ্নে নতুন মোড়ে ব্রিটিশ রাজনীতি স্টারমারের নেতৃত্বে ঝড়, ইউরোপ ঘিরে নতুন বার্তা দিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লড়াই হারিপুরের তেল এখনও মাটির নিচে? তিন দশক পরও অমীমাংসিত বাংলাদেশের প্রথম তেলক্ষেত্রের রহস্য মোদির সাশ্রয় বার্তা, এক বছর সোনা না কেনার আহ্বান ভারতবাসীর প্রতি চীনের জ্বালানি কূটনীতি: ইরান যুদ্ধের সংকটে এশিয়াজুড়ে বাড়ছে বেইজিংয়ের প্রভাব এআই দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ কি কেবল ধনকুবেরদের হাতেই যাচ্ছে? জাপানের ছোট্ট চিড়িয়াখানায় ‘পাঞ্চ’-এর জাদু, একা বানরশিশুকে দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড়

স্টারমারের সংকট: নেতৃত্বের প্রশ্নে নতুন মোড়ে ব্রিটিশ রাজনীতি

ব্রিটেনের রাজনীতিতে কখনও কখনও এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল একটি নির্বাচনী ব্যর্থতা নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। কিয়ার স্টারমারের জন্য সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচন ঠিক তেমন এক ধাক্কা হয়ে এসেছে। কয়েক বছর আগেও যিনি লেবার পার্টিকে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, এখন তাকেই নিজের দলের ভেতর থেকে নেতৃত্ব ছাড়ার আহ্বান শুনতে হচ্ছে।

এই সংকটের গভীরতা শুধু ভোটের ফলাফলে নয়, বরং ফলাফলের পর স্টারমারের প্রতিক্রিয়ায়ও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু নেতা বড় পরাজয়ের পর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে পুনর্গঠনের পথে হাঁটেন। কিন্তু স্টারমারের ক্ষেত্রে সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি যেন পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন না করেই ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার স্বপ্নের কথা বলে যাচ্ছেন। যখন সংসদ সদস্যদের একাংশ প্রশ্ন তুলছে তিনি আদৌ সপ্তাহ পার করতে পারবেন কি না, তখন তার দ্বিতীয় মেয়াদের পরিকল্পনার কথা বলা অনেকের কাছেই রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ বলে মনে হয়েছে।

Starmer to say 'incremental change won't cut it' in major make-or-break  speech to avert leadership challenge – UK politics live

লেবারের ভেতরের ক্ষোভও এখন আর গোপন নেই। একসময় যারা স্টারমারের পক্ষে দাঁড়াতেন, তারাও এখন হতাশ। স্থানীয় নির্বাচনে শতাব্দীপ্রাচীন ঘাঁটিতে ধস, স্কটল্যান্ডে রিফর্ম ইউকের সঙ্গে সমতায় নেমে আসা এবং হাজারের বেশি কাউন্সিলর হারানো—এসব কেবল সাময়িক ব্যর্থতা নয়। এগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, ভোটারদের এক বড় অংশ লেবারকে আর আগের মতো দেখছে না।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নেতৃত্বের বিকল্প নিয়ে দলটির অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ। অ্যাঞ্জেলা রেইনার, ওয়েস স্ট্রিটিং কিংবা অ্যান্ডি বার্নহ্যামের মতো নেতাদের নাম ঘুরে ফিরে আসছে। কিন্তু তাদের কেউই সরাসরি বিদ্রোহের প্রথম মুখ হতে চাইছেন না। কারণ ব্রিটিশ রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্ব বদলের লড়াই প্রায়ই দলকে আরও দুর্বল করে দেয়। থেরেসা মে বা বরিস জনসনের সময় কনজারভেটিভ পার্টির অভ্যন্তরীণ সংঘাত ভোটারদের আস্থাকে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, সেই স্মৃতি এখনো তাজা।

তবু লেবারের বর্তমান অবস্থা আলাদা। এখানে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের কৌশলগত প্রশ্ন নয়, বরং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রশ্নও সামনে এসেছে। রেইনারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে “ধনীদের দল” হয়ে ওঠার ঝুঁকির যে সতর্কতা ছিল, তা আসলে বৃহত্তর উদ্বেগের প্রতিফলন। দলের একাংশ মনে করছে, স্টারমার মধ্যপন্থী গ্রহণযোগ্যতার খোঁজে গিয়ে লেবারের ঐতিহ্যগত সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন। অন্যদিকে আরেক অংশ মনে করে, আরও বামঘেঁষা অবস্থান নিলে মধ্যবিত্ত ভোটারদের হারানোর ঝুঁকি বাড়বে।

It can be survivable': Inside Keir Starmer's efforts to stop a coup –  POLITICO

এই দ্বন্দ্বই এখন লেবারের মূল সংকট। দলটি কি নির্বাচনী বাস্তবতার কারণে আদর্শিক নমনীয়তা বজায় রাখবে, নাকি কর্মীভিত্তিক পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থানে ফিরবে? স্টারমার এতদিন এই দুই ধারার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ফলাফল সেই ভারসাম্যের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। স্টারমারের ঘনিষ্ঠদের অনেকে মনে করেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিতর্ক দলকে আরও অস্থিতিশীল করবে। কিন্তু সমালোচকদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, যদি ভোটাররাই নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তাহলে কেবল ঐক্যের নামে সেই নেতৃত্ব আঁকড়ে থাকার অর্থ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।

সব মিলিয়ে স্টারমারের সামনে এখন এমন এক পরীক্ষা, যেখানে কেবল ভাষণ বা কৌশলগত পুনর্বিন্যাস যথেষ্ট নাও হতে পারে। তিনি হয়তো এখনো প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ ইতোমধ্যে তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু ডাউনিং স্ট্রিটের কক্ষ নয়, বরং লেবার এমপিদের ধৈর্য, ভোটারদের আস্থা এবং বিকল্প নেতৃত্বের সাহস।

ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাসে অনেক নেতা সংকট থেকে ফিরে এসেছেন। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রথম শর্ত হলো বাস্তবতা স্বীকার করা। স্টারমারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটিই—তিনি কি সত্যিই বুঝতে পারছেন তার দল এবং দেশ তাকে কী বলতে চাইছে?

Brand Britain has bounced back

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল ইস্যুতে বিভক্ত আমেরিকার কট্টর ডানপন্থী শিবির, রিপাবলিকান রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ

স্টারমারের সংকট: নেতৃত্বের প্রশ্নে নতুন মোড়ে ব্রিটিশ রাজনীতি

০৩:১১:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

ব্রিটেনের রাজনীতিতে কখনও কখনও এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল একটি নির্বাচনী ব্যর্থতা নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। কিয়ার স্টারমারের জন্য সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচন ঠিক তেমন এক ধাক্কা হয়ে এসেছে। কয়েক বছর আগেও যিনি লেবার পার্টিকে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, এখন তাকেই নিজের দলের ভেতর থেকে নেতৃত্ব ছাড়ার আহ্বান শুনতে হচ্ছে।

এই সংকটের গভীরতা শুধু ভোটের ফলাফলে নয়, বরং ফলাফলের পর স্টারমারের প্রতিক্রিয়ায়ও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু নেতা বড় পরাজয়ের পর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে পুনর্গঠনের পথে হাঁটেন। কিন্তু স্টারমারের ক্ষেত্রে সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি যেন পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন না করেই ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার স্বপ্নের কথা বলে যাচ্ছেন। যখন সংসদ সদস্যদের একাংশ প্রশ্ন তুলছে তিনি আদৌ সপ্তাহ পার করতে পারবেন কি না, তখন তার দ্বিতীয় মেয়াদের পরিকল্পনার কথা বলা অনেকের কাছেই রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ বলে মনে হয়েছে।

Starmer to say 'incremental change won't cut it' in major make-or-break  speech to avert leadership challenge – UK politics live

লেবারের ভেতরের ক্ষোভও এখন আর গোপন নেই। একসময় যারা স্টারমারের পক্ষে দাঁড়াতেন, তারাও এখন হতাশ। স্থানীয় নির্বাচনে শতাব্দীপ্রাচীন ঘাঁটিতে ধস, স্কটল্যান্ডে রিফর্ম ইউকের সঙ্গে সমতায় নেমে আসা এবং হাজারের বেশি কাউন্সিলর হারানো—এসব কেবল সাময়িক ব্যর্থতা নয়। এগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, ভোটারদের এক বড় অংশ লেবারকে আর আগের মতো দেখছে না।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নেতৃত্বের বিকল্প নিয়ে দলটির অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ। অ্যাঞ্জেলা রেইনার, ওয়েস স্ট্রিটিং কিংবা অ্যান্ডি বার্নহ্যামের মতো নেতাদের নাম ঘুরে ফিরে আসছে। কিন্তু তাদের কেউই সরাসরি বিদ্রোহের প্রথম মুখ হতে চাইছেন না। কারণ ব্রিটিশ রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্ব বদলের লড়াই প্রায়ই দলকে আরও দুর্বল করে দেয়। থেরেসা মে বা বরিস জনসনের সময় কনজারভেটিভ পার্টির অভ্যন্তরীণ সংঘাত ভোটারদের আস্থাকে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, সেই স্মৃতি এখনো তাজা।

তবু লেবারের বর্তমান অবস্থা আলাদা। এখানে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের কৌশলগত প্রশ্ন নয়, বরং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রশ্নও সামনে এসেছে। রেইনারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে “ধনীদের দল” হয়ে ওঠার ঝুঁকির যে সতর্কতা ছিল, তা আসলে বৃহত্তর উদ্বেগের প্রতিফলন। দলের একাংশ মনে করছে, স্টারমার মধ্যপন্থী গ্রহণযোগ্যতার খোঁজে গিয়ে লেবারের ঐতিহ্যগত সামাজিক ন্যায়ের রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন। অন্যদিকে আরেক অংশ মনে করে, আরও বামঘেঁষা অবস্থান নিলে মধ্যবিত্ত ভোটারদের হারানোর ঝুঁকি বাড়বে।

It can be survivable': Inside Keir Starmer's efforts to stop a coup –  POLITICO

এই দ্বন্দ্বই এখন লেবারের মূল সংকট। দলটি কি নির্বাচনী বাস্তবতার কারণে আদর্শিক নমনীয়তা বজায় রাখবে, নাকি কর্মীভিত্তিক পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থানে ফিরবে? স্টারমার এতদিন এই দুই ধারার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ফলাফল সেই ভারসাম্যের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। স্টারমারের ঘনিষ্ঠদের অনেকে মনে করেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিতর্ক দলকে আরও অস্থিতিশীল করবে। কিন্তু সমালোচকদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, যদি ভোটাররাই নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তাহলে কেবল ঐক্যের নামে সেই নেতৃত্ব আঁকড়ে থাকার অর্থ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা।

সব মিলিয়ে স্টারমারের সামনে এখন এমন এক পরীক্ষা, যেখানে কেবল ভাষণ বা কৌশলগত পুনর্বিন্যাস যথেষ্ট নাও হতে পারে। তিনি হয়তো এখনো প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ ইতোমধ্যে তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু ডাউনিং স্ট্রিটের কক্ষ নয়, বরং লেবার এমপিদের ধৈর্য, ভোটারদের আস্থা এবং বিকল্প নেতৃত্বের সাহস।

ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাসে অনেক নেতা সংকট থেকে ফিরে এসেছেন। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রথম শর্ত হলো বাস্তবতা স্বীকার করা। স্টারমারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটিই—তিনি কি সত্যিই বুঝতে পারছেন তার দল এবং দেশ তাকে কী বলতে চাইছে?

Brand Britain has bounced back