বিশ্বজুড়ে রাজনীতি ও ক্ষমতার ভাষা দ্রুত বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু নির্বাচনী প্রচারণা বা রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়; তা এখন দৃশ্যমান হচ্ছে স্থাপত্য, স্মৃতিস্তম্ভ এবং ব্যক্তিপূজার নতুন সংস্কৃতিতেও। বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাবান নেতা ও প্রযুক্তি ধনকুবেররা নিজেদের ঘিরে এমন সব বিশাল প্রকল্প নির্মাণ করছেন, যা নিছক স্থাপত্য নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা। সেই বার্তা হলো—ক্ষমতা শুধু প্রয়োগের বিষয় নয়, প্রদর্শনের বিষয়ও।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে সাম্প্রতিক নানা পরিকল্পনা এই প্রবণতার স্পষ্ট উদাহরণ। বিশাল স্বর্ণমণ্ডিত মূর্তি, আকাশছোঁয়া প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি, নেপোলিয়নের বিজয়তোরণের অনুকরণে নির্মাণের প্রস্তাব—সবকিছুতেই ব্যক্তিগত মহিমা প্রতিষ্ঠার প্রবল আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। এসব প্রকল্প রাজনৈতিক স্মারকের চেয়েও বেশি কিছু। এগুলো এমন এক ক্ষমতার ভাষা, যা নাগরিকদের মুগ্ধ করতে চায়, একই সঙ্গে ক্ষমতার বিশালত্বকে দৃশ্যমান করে তুলতে চায়।
তবে এই সংস্কৃতি কেবল রাজনীতিবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি জগতের বিলিয়নিয়াররাও এখন নিজেদের কল্পনা ও প্রভাবকে বিশাল স্থাপত্যে রূপ দিতে আগ্রহী। জেফ বেজোস পাহাড়ের ভেতরে ১০ হাজার বছরের ঘড়ি নির্মাণ করছেন। ইলন মাস্ক নিজের শহর গড়ে তুলছেন। অন্যরা সমুদ্রভিত্তিক স্বাধীন নগরী কিংবা দৈত্যাকার প্রতীকী ভাস্কর্যের স্বপ্ন দেখছেন। এসব প্রকল্পে প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেমন আছে, তেমনি আছে নিজের নাম ও প্রভাবকে স্থায়ী করে রাখার আকাঙ্ক্ষাও।
ইতিহাসে ক্ষমতার এমন প্রদর্শনী সাধারণত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ছিল। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের ভার্সাই প্রাসাদ, সোভিয়েত ইউনিয়নের জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজ কিংবা স্টালিনের বিশাল প্রতিকৃতি—সবই ছিল ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রদর্শন। এসব ব্যবস্থায় শাসকরা বিশ্বাস করতেন, মানুষকে যুক্তির চেয়ে দৃশ্যের মাধ্যমে বেশি প্রভাবিত করা যায়। বিশাল স্থাপনা, বর্ণাঢ্য আয়োজন এবং নেতার সর্বব্যাপী উপস্থিতি নাগরিকদের মনে এক ধরনের মানসিক আনুগত্য তৈরি করে।
গণতান্ত্রিক সমাজ ঐতিহাসিকভাবে এই প্রবণতার বিপরীত পথে হেঁটেছে। সেখানে নেতাদের দেবত্ব দেওয়ার বদলে জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং নাগরিক সমালোচনা—সব মিলিয়ে কোনো ব্যক্তিকে অতিমানব হয়ে ওঠার সুযোগ কম থাকে। এ কারণেই অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকারি স্থাপনা তুলনামূলকভাবে সংযত ও কার্যকরধর্মী। সেগুলোর লক্ষ্য নাগরিকদের বিস্মিত করা নয়, বরং সেবা দেওয়া।

কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সেই ভারসাম্য বদলাতে শুরু করেছে। এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক শক্তির প্রদর্শনীকে আর অস্বাভাবিক মনে করা হচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি ধনকুবেররা নিজেদের পরিবারকে ঘিরে বিশাল ভাস্কর্য নির্মাণ করছেন, উদ্যোক্তারা পৌরাণিক প্রতীককে ব্যবহার করে নিজেদের ভাবমূর্তি গড়ছেন, আর রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের উত্তরাধিকারকে স্থায়ী করতে বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
একসময় ধনীদের মধ্যে একটি অলিখিত সামাজিক চাপ ছিল—নিজেদের সম্পদ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার। গ্রন্থাগার, জাদুঘর, হাসপাতাল বা বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ ছিল সেই সংস্কৃতির অংশ। ব্যক্তিগত গৌরব থাকলেও তার সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এখন সেই সীমারেখা দুর্বল হয়ে পড়ছে। নতুন প্রজন্মের ধনকুবের ও জনপ্রিয়তাবাদী নেতাদের একাংশ সরাসরি নিজেদের ব্যক্তিগত মহিমাকেই সামনে নিয়ে আসছেন।
এ প্রবণতা কেবল রুচির পরিবর্তন নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য শুধু নির্বাচন বা সংবিধান দিয়ে বিচার করা যায় না। সমাজ তার নেতাদের কীভাবে দেখে, ক্ষমতার প্রদর্শনীকে কতটা স্বাভাবিক মনে করে এবং ব্যক্তিপূজাকে কতটা গ্রহণযোগ্য বানায়—এসবও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
আজকের বিশ্বে বিশাল মূর্তি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্থাপত্য এবং ক্ষমতার জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনী তাই নিছক স্থাপত্যের বিষয় নয়। এগুলো এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন গণতান্ত্রিক সংযম দুর্বল হচ্ছে এবং ক্ষমতার নাটকীয় প্রদর্শন আবারও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সেই কারণেই এসব স্থাপনা কেবল পাথর, ধাতু বা কংক্রিট নয়; এগুলো রাজনৈতিক মানসিকতারও প্রতীক।
জেমস ম্যারিয়ট ব্রিটিশ কলামিস্ট ও লেখক।
জেমস ম্যারিয়ট 


















