সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও রক্তপাতের স্মৃতি এখনও দেশটির মানুষের মনে তাজা। সেই অন্ধকার সময়ের অন্যতম আলোচিত মুখ আতেফ নাজিব এবার আদালতের কাঠগড়ায়। একসময় দক্ষিণ সিরিয়ার দেরা শহরের নিরাপত্তা প্রধান হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা এখন হত্যা, নির্যাতন ও গণহত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি।
২০১১ সালে দেরা শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হলে বহু কিশোরকে আটক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তাদের পরিবারের সদস্যরা মুক্তির আবেদন জানাতে গেলে আতেফ নাজিব নির্মম আচরণ করেন। সেই ঘটনাকেই অনেকে সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সূচনা হিসেবে দেখেন। এখন রাজধানী দামেস্কের আদালতে তাকে বন্দি পোশাকে হাজির হতে হচ্ছে।
বিচার ঘিরে নতুন প্রত্যাশা
আদালতে মামলার শুনানি শুরু হওয়ার পর অনেক ভুক্তভোগী ও মানবাধিকারকর্মী এটিকে ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। বহু মানুষের মতে, এটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিচার নয়, বরং দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের প্রতীকী জবাব।
যারা একসময় দেরায় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তাদের অনেকে এখন এই মামলার সঙ্গে যুক্ত। তারা বলছেন, বছরের পর বছর অপেক্ষার পর অবশেষে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে কিছুটা হলেও আশার জন্ম হয়েছে।
সব অভিযোগ অস্বীকার
গত ১০ মে আদালতে হাজির হয়ে আতেফ নাজিব নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, দেরায় দমন-পীড়নের জন্য অন্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দায়ী ছিল। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবেও পরিচিত।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের হেফাজতে থাকা সাবেক শাসকগোষ্ঠীর সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি।

বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক
তবে এই বিচার নিয়ে প্রশ্নও কম নয়। সিরিয়ার নতুন সরকার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে চাইলেও অনেক আইনজীবী ও বিশ্লেষক বলছেন, এখনো দেশটিতে পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরকালীন বিচার কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
সমালোচকদের মতে, শুধু সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে, কিন্তু গৃহযুদ্ধের সময় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। এতে বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।
আরও একটি বড় সমস্যা হলো, সিরিয়ার বিদ্যমান আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। ফলে আদালতকে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের সহায়তা নিতে হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে বাড়ছে প্রতিশোধমূলক সহিংসতা
রাজধানী দামেস্কের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও প্রতিশোধমূলক হামলার ঘটনাও বাড়ছে। বিশেষ করে সাবেক সরকারের সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ উঠছে। অনেকের ধারণা, বিচার প্রক্রিয়া ধীর হওয়ায় সাধারণ মানুষ নিজেরাই প্রতিশোধ নেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে।
এ অবস্থায় সরকার দ্রুত বিচার দেখিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। তবে তাড়াহুড়ো করে বিচার করলে সেটির গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষায় সিরিয়া
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে চলা আসাদ পরিবারের শাসন সিরিয়ার বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। তাই এখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। তারপরও অনেক ভুক্তভোগীর কাছে এই বিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে—সিরিয়ার মানুষের রক্তের মূল্য আছে এবং অতীতের অপরাধ একদিন না একদিন বিচারের মুখোমুখি হবেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















