আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠী এম২৩ এখন শুধু যুদ্ধই করছে না, ধীরে ধীরে গড়ে তুলছে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এক বিকল্প প্রশাসনিক কাঠামো। উত্তর ও দক্ষিণ কিভু অঞ্চলের বিশাল অংশ দখলে নিয়ে তারা এখন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরির চেষ্টায় নেমেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খনিজ সম্পদভিত্তিক সমঝোতার প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিদ্রোহীদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকা বিরল খনিজ ও থ্রিটি ধাতু বিশ্ববাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পদকে কেন্দ্র করেই তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি দাঁড় করাতে চাইছে। এম২৩ের রাজনৈতিক শাখার নেতারা ইতোমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে নানা পরিকল্পনা তুলে ধরছেন।
সংঘাতের পেছনের বাস্তবতা
কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলের এই সংঘাত বহু বছরের পুরোনো। এম২৩ মূলত কঙ্গোর তুতসি সম্প্রদায়ভিত্তিক একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা অভিযোগ করে আসছে যে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। অন্যদিকে কঙ্গো সরকার ও আন্তর্জাতিক মহলের অভিযোগ, প্রতিবেশী রুয়ান্ডা এই গোষ্ঠীকে সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছে।
এই সংঘাত এখন শুধু গৃহযুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। খনিজ সম্পদ, সীমান্ত রাজনীতি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে এটি এক ধরনের প্রক্সি যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
গোমায় নতুন শাসনব্যবস্থা
উত্তর কিভুর রাজধানী গোমায় এখন এম২৩ নিজেদের নিয়মে প্রশাসন চালানোর চেষ্টা করছে। বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা বদলি করা হয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব বসানো হয়েছে। শহরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নতুন পুলিশ ইউনিফর্ম এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা এক ধরনের নতুন শাসনব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরছে।
স্থানীয় অনেক মানুষ বলছেন, ছোটখাটো অপরাধ কিছুটা কমেছে। রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা যাচ্ছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আগের তুলনায় স্থিতিশীল মনে হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি ভয়ও বাড়ছে। অনেক পরিবার অভিযোগ করছে, তরুণদের জোর করে দলে নেওয়া হচ্ছে। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকটে জনজীবন
যুদ্ধের কারণে কিভু অঞ্চলের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংক বন্ধ থাকায় মানুষ নিজেদের সঞ্চয় তুলতে পারছে না। বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় বাণিজ্য ও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বাজারে ক্রেতা কমে গেছে, ব্যবসায়ীরা আয়ের বড় পতনের কথা বলছেন।
একসময় প্রতিদিন কয়েকশ ডলারের ব্যবসা করা দোকান এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। কৃষকেরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে মাঠে যেতে পারছেন না। বাজারে পণ্য সরবরাহও কমে গেছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে।
খনিজ সম্পদ ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ
এম২৩ের নিয়ন্ত্রণে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি রুবায়া, যেখানে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ট্যানটালাম মজুত রয়েছে। এই খনিজ আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্রোহীরা এখন এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে।
তাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র যদি কঙ্গোর সরকারের সঙ্গে খনিজ চুক্তি করতে পারে, তাহলে এম২৩ নিয়ন্ত্রিত এলাকাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এ নিয়ে তারা বিভিন্ন পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ প্রস্তাব তুলে ধরছে। যদিও বাস্তবে এম২৩ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে এবং কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র পরিচালনা করছে না।
সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত
বর্তমানে কঙ্গো, রুয়ান্ডা এবং এম২৩কে ঘিরে একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ চলছে। তবে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান এখনো অনেক দূরের পথ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সামরিক জয় যেমন কঠিন, তেমনি রাজনৈতিক সমঝোতাও সহজ নয়। এর মধ্যে এম২৩ ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।
পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল কার্যত আলাদা এক ক্ষমতাকাঠামোয় পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে পুরো মধ্য আফ্রিকার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















