কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় সাধারণত আলোচনায় থাকে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, চিপ নির্মাতা কিংবা সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো। কিন্তু জাপানে এআই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের তালিকায় উঠে এসেছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান, যাদের মূল ব্যবসার সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক একসময় কল্পনাও করা যেত না। খাবারের স্বাদবর্ধক উপাদান, টয়লেট, চশমা কিংবা রঙ পেন্সিল তৈরির কোম্পানিগুলো এখন বৈশ্বিক এআই সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে এআই চিপের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাপানের বহু পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজেদের নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করছে। দীর্ঘদিনের গবেষণা, বিশেষায়িত উপকরণ এবং ধৈর্যশীল বিনিয়োগ এখন তাদের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
স্বাদবর্ধক উপাদান থেকে এআই প্রযুক্তি
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে খাদ্যে স্বাদবর্ধক উপাদান তৈরির জন্য পরিচিত আজিনোমোতো এখন এআই শিল্পের আলোচিত নাম। কোম্পানিটির তৈরি বিশেষ ধরনের পাতলা উপাদান উন্নত এআই প্রসেসরকে সার্কিট বোর্ড থেকে আলাদা রাখতে ব্যবহৃত হয়। এই প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল খাদ্য উপাদান উৎপাদনের রাসায়নিক গবেষণা থেকে।
![]()
বর্তমানে এই বিশেষ উপাদানের বৈশ্বিক বাজারে প্রায় একচ্ছত্র অবস্থান তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এআই চিপের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তাদের পণ্যের সংকটও তৈরি হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে এবং কোম্পানিটির শেয়ারমূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
টয়লেট নির্মাতা এখন চিপ শিল্পের অংশ
বিশ্বের অন্যতম বড় টয়লেট নির্মাতা টোটোও এখন সেমিকন্ডাক্টর খাতের গুরুত্বপূর্ণ নাম। প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ ধরনের সিরামিক প্লেট তৈরি করে, যা চিপ উৎপাদনের সময় সিলিকন ওয়েফার স্থির রাখতে ব্যবহৃত হয়।
একসময় যাদের পরিচয় ছিল শুধুই বাথরুম পণ্যের নির্মাতা হিসেবে, এখন তাদের আয়ের বড় অংশ আসছে উন্নত শিল্পপ্রযুক্তি থেকে। এআই শিল্পের বিস্তার এই ব্যবসাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
পুরোনো দক্ষতার নতুন ব্যবহার
জাপানের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একইভাবে নিজেদের পুরোনো প্রযুক্তিকে নতুনভাবে কাজে লাগাচ্ছে। চশমা ও কনট্যাক্ট লেন্স নির্মাতা হোয়া এখন চিপ ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সরবরাহ করছে। স্টেশনারি ব্র্যান্ড সাকুরা রঙ পেন্সিল তৈরির অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে চিপ উৎপাদনের ত্রুটি শনাক্ত করার প্রযুক্তি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে বস্ত্র কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করা নিট্টো বোসেকি এখন এমন বিশেষ কাচ তন্তু তৈরি করছে, যা এআই চিপ প্যাকেজিংয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পণ্যের একমাত্র সরবরাহকারীও তারাই।
জাপানের পুরোনো শিল্পশক্তির প্রত্যাবর্তন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে জাপানের দীর্ঘ শিল্প ইতিহাস। আশির দশকে বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর বাজারে জাপানের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সে সময় দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ব চিপ উৎপাদনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত।
সেই সময় গড়ে ওঠা প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সরবরাহ নেটওয়ার্ক এখনও জাপানকে এগিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে চিপ উৎপাদনের উপকরণ ও যন্ত্রাংশ তৈরিতে দেশটির দক্ষতা এখনও বিশ্বমানের বলে বিবেচিত হয়।
ধৈর্যের সংস্কৃতিই বড় শক্তি

বিশ্লেষকদের মতে, জাপানি কোম্পানিগুলোর বড় বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দ্রুত মুনাফা না এলেও তারা প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ চালিয়ে যায় এবং সহজে কোনো প্রকল্প বন্ধ করে না।
আজিনোমোতো বহু বছর আগে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিল, যখন এর কোনো বড় বাজারই ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গবেষণাই এখন তাদের সবচেয়ে লাভজনক সম্পদে পরিণত হয়েছে।
তবে এই ধৈর্যের সংস্কৃতির কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। হঠাৎ চাহিদা বেড়ে গেলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে না। অনেক কোম্পানি এখন উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিলেও, এআই শিল্পের দ্রুত গতির তুলনায় তাদের পদক্ষেপ এখনও ধীর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তারপরও প্রযুক্তি দুনিয়ায় জাপানের এই অপ্রত্যাশিত বিজয়ীরা দেখিয়ে দিচ্ছে, পুরোনো শিল্প দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা কখনও কখনও ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















