অবসরজীবন সাধারণত শান্তি আর নিশ্চিন্ত সময় কাটানোর প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, চিকিৎসা খরচ এবং দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপের কারণে বহু প্রবীণ নাগরিক অবসরের পর আবার কাজে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।
৭৩ বছর বয়সী প্যাট আর্চার কয়েক বছর আগে অবসর নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন একটি আলো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। অবসরের পর ভেবেছিলেন সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা ও সামান্য পেনশন দিয়েই স্বামীকে নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধের খরচ এবং নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত চার বছর আগে আবার চাকরিতে ফিরতে বাধ্য হন তিনি। বর্তমানে বোস্টনের বাইরে একটি সহায়তাপ্রাপ্ত আবাসিক কেন্দ্রে খণ্ডকালীন কাজ করছেন।
মূল্যস্ফীতির চাপ

যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, বিদ্যুৎ এবং স্বাস্থ্যসেবার খরচ বাড়ায় নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল প্রবীণদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা হলেও বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে সেই সমন্বয় প্রায়ই পিছিয়ে থাকে। ফলে অবসরপ্রাপ্তদের অনেকে আবার চাকরির বাজারে ফিরছেন।
এক জরিপে দেখা গেছে, ৫০ বছরের বেশি বয়সী যারা অবসরের পর আবার কাজে ফিরেছেন, তাদের প্রায় অর্ধেকই অর্থনৈতিক চাপে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
‘অবসর থেকে বরখাস্ত’
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, অনেক প্রবীণ কার্যত “অবসর থেকে বরখাস্ত” হচ্ছেন। অর্থাৎ অবসর নেওয়ার পরও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাদের আবার কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনছে।
বর্তমানে ৫৫ বছরের বেশি বয়সী মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশ কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে মহামারির পর শ্রমবাজারে কর্মীর চাহিদা বাড়ায় অনেক প্রবীণ সহজেই নতুন কাজ পেয়েছেন।

তবে শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা তুলনামূলক দ্রুত কাজ পেলেও কম শিক্ষিত প্রবীণদের জন্য চাকরি পাওয়া এখনও কঠিন।
সংসারের দায়িত্বও বড় কারণ
৫৭ বছর বয়সী ব্র্যান্ডট হেস দীর্ঘদিন পুলিশ বিভাগে কাজ করার পর অবসর নেন। মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে চাইলেও অবসরের পর দ্রুত বুঝতে পারেন, পেনশনের অর্থ দিয়ে আগের জীবনযাত্রা ধরে রাখা সম্ভব নয়।
বাড়ির ঋণ, খাদ্য ব্যয় এবং পরিবারের খরচ সামলাতে আবার কাজে ফিরেছেন তিনি। বর্তমানে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি তদন্তের কাজ করছেন।
তার তিন সন্তান এখনও পরিবারের সঙ্গেই থাকেন। সন্তানদের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার শুরুর সময় আর্থিক সহায়তা দিতে হচ্ছে তাকেই।
অসুস্থতা পেরিয়েও কাজে ফেরা
৭২ বছর বয়সী জেমস জোন্স ক্যানসারের কারণে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে আবার রান্নাঘরের কাজে যোগ দেন। এখন প্রতিদিন ভোরে কাজে যান তিনি।

তার ভাষায়, কাজ শুধু অর্থের জন্য নয়, সক্রিয় থাকার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সামান্য আয়ের মধ্যেও টেলিভিশনের কেবল সংযোগের খরচ পর্যন্ত এখন অনেক বেশি মনে হয়।
বদলে যাওয়া অবসরজীবন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবসরজীবনের ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে অবসর মানেই আর্থিক নিশ্চয়তা ছিল, এখন অনেকের কাছে তা হয়ে উঠছে নতুন অনিশ্চয়তার শুরু।
বাড়তি মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে বহু প্রবীণ আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, তারা কাজ করতে আপত্তি করেন না, কিন্তু বাধ্য হয়ে কাজে ফিরতে হওয়াটাই সবচেয়ে কষ্টের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















