ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রা রুপিয়ার মূল্যপতনের প্রভাব এখন সরাসরি পড়ছে দেশের স্বাস্থ্য খাতে। ওষুধের দাম বাড়তে থাকায় দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত বহু মানুষ চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ওষুধের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
চিকিৎসা ব্যয়ে হোঁচট খাচ্ছেন রোগীরা
উত্তর সুমাত্রার মেদানের ৪৩ বছর বয়সী থাইরয়েড ক্যানসার রোগী লিলি হাসতুতি জানান, ওষুধের বাড়তি খরচের কারণে সম্প্রতি তাকে দুই দিনের জন্য চিকিৎসা বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ছয় মাস আগে ক্যানসার ধরা পড়ার পর দুই মাস ধরে তিনি নিয়মিত ওষুধ সেবন করছেন।
প্রতি মাসে তার ছয় ধরনের ওষুধ কিনতে প্রায় ৬২ লাখ রুপিয়া ব্যয় হয়। গৃহিণী লিলির পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তার সরকারি চাকরিজীবী স্বামী। এই আয়ে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ভাইবোনদের আর্থিক সহায়তায় চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসাও ব্যয়বহুল
ইয়োগ্যাকার্তার বাসিন্দা তান্তিও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। সম্প্রতি তিনি তার ৮১ বছর বয়সী মায়ের হৃদরোগ ও হাঁপানির চিকিৎসার জন্য ওষুধ কিনতে গিয়ে আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে ওষুধ, চিকিৎসক পরামর্শ ও ইসিজিসহ মোট খরচ ছিল প্রায় ৪০ লাখ রুপিয়া, এখন তা বেড়ে ৫১ লাখ রুপিয়ায় পৌঁছেছে। চিকিৎসকদের ফি অপরিবর্তিত থাকলেও শুধু ওষুধের দামই প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। মায়ের সুস্থতার জন্য এসব ওষুধ অপরিহার্য হওয়ায় বাড়তি ব্যয় মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।
বিদেশে চিকিৎসা করানোও কঠিন হয়ে উঠছে
রুপিয়ার দুর্বলতার কারণে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার খরচও বেড়েছে। রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জের বাতামের বাসিন্দা এসমেরালদা উইনেকে জানান, তার স্বামী হৃদরোগের অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত ফলো-আপ চিকিৎসার জন্য মালয়েশিয়ার পেনাং যেতেন। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসা ব্যয়, ভ্রমণ খরচ ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই যাতায়াত বন্ধ করতে হয়েছে।
তার স্বামীর প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ ইন্দোনেশিয়ায় পাওয়া যায় না। ফলে বিদেশ থেকে ব্যক্তিগত ক্রয়সেবার মাধ্যমে ওষুধ আনাতে হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে প্রায় ২৪ লাখ রুপিয়া খরচ হচ্ছে। যদিও এ ধরনের ব্যবস্থায় নকল ওষুধ, সংরক্ষণজনিত সমস্যা বা শুল্কসংক্রান্ত ঝুঁকি রয়েছে, তবুও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে তারা এই পথই বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
আমদানি নির্ভরতা বড় কারণ
ইন্দোনেশিয়ান কনজিউমার্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান তুলুস আবাদি বলেন, রুপিয়ার অবমূল্যায়নের ফলে ওষুধ ও ভিটামিনের দাম বাড়া প্রায় অনিবার্য। কারণ দেশটির ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর।
তার মতে, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওষুধ ব্যবহারের হার আরও কমিয়ে দিতে পারে। এমনকি এটি দেশের জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা সংস্থা বিপিজেএস কেসেহাতানের ওপরও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধ সংগ্রহে বেশি খরচ করলে তারা বেশি অর্থ ফেরত চাইবে।
সরকারের আশ্বাস
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বুদি গুনাদি সাদিকিন জানিয়েছেন, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকার বৈঠক করেছে যাতে মূল্যবৃদ্ধি ২০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তার মতে, ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতির কারণে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তবে এর বেশি বৃদ্ধি অযৌক্তিক।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা সংস্থা এখনো ওষুধের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে সক্ষম এবং অংশগ্রহণকারীদের স্বাস্থ্যসেবা কভারেজ অব্যাহত থাকবে।
রুপিয়ার অবমূল্যায়ন কেবল অর্থনীতিতেই নয়, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়েও বড় চাপ তৈরি করছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন, যাদের চিকিৎসা বন্ধ করার সুযোগ নেই।
#ইন্দোনেশিয়া #রুপিয়া #ওষুধেরদাম #স্বাস্থ্যখাত #দীর্ঘমেয়াদিরোগী #চিকিৎসাব্যয় #মুদ্রাস্ফীতি #আন্তর্জাতিকসংবাদ
Sarakhon Report 


















