ঈদুল আজহা সামনে রেখে নওগাঁর বিভিন্ন পশুর হাটে এখন জমে উঠেছে কেনাবেচা। প্রতিদিন হাজার হাজার কোরবানির পশু উঠছে জেলার বড় বড় হাটে। তবে উৎসবের প্রস্তুতির মাঝেও বাড়তি উৎপাদন খরচ এবং সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশের আশঙ্কায় উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় খামারিরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১১টি উপজেলায় ৩৮ হাজার ৯০৯ জন ছোট-বড় খামারি এবার প্রায় ৮ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া প্রস্তুত করেছেন। অথচ জেলার মোট চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার পশু। ফলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার পশু দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জমে উঠেছে জেলার বড় পশুর হাট
নওগাঁ সদর উপজেলার রাধাকান্ত হাট, মান্দার চৌবাড়িয়া হাট ও সতি হাট, আত্রাইয়ের আহসানগঞ্জ হাট, মহাদেবপুরের চাকগৌরী হাট ও মাতাজী হাট, পত্নীতলার নজিপুর হাট এবং বদলগাছীর কোলা হাটে এখন উপচে পড়া ভিড়। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতিদিন এসব হাটে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার পশু উঠছে।
হাটের পাশাপাশি খামারগুলোতেও ব্যস্ত সময় পার করছেন মালিক ও শ্রমিকরা। পশুকে গোসল করানো, খাবার দেওয়া ও পরিচর্যায় দিনরাত কাজ করছেন তারা। খামারিরা জানিয়েছেন, এ বছর তারা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণে গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে ক্রেতারা স্বাস্থ্যসম্মত পশু পান।
খাদ্যের দাম বাড়ায় বাড়ছে চাপ
তবে পশুখাদ্যের লাগামহীন দাম খামারিদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল এলাকার খামারি একরামুল হাসান জানান, তিনি এবার ১০৬টি গরু ও ৩১টি ছাগল প্রস্তুত করেছেন। তার অধিকাংশ গরুই শাহীওয়াল জাতের।
তিনি বলেন, প্রতিটি গরুর দাম দেড় লাখ থেকে চার লাখ টাকার মধ্যে। গরুকে প্রতিদিন তিনবার করে আটা, ভুসি, খৈল, খড় ও ঘাস খাওয়াতে হচ্ছে। কিন্তু খাদ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আরেক খামারি উজ্জ্বল হোসেন জানান, কয়েক মাসের ব্যবধানে পশুখাদ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে যে ৫০ কেজির একটি খাদ্যের বস্তা ১ হাজার ৮০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্য একটি খাদ্যের দাম ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আবার ৮০০ টাকার খাদ্য এখন ১ হাজার ৩০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাজারে ভালো দাম না পেলে ছোট খামারিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।
শ্রমিক খরচও বেড়েছে
আরজি নওগাঁ এলাকার খামারি সাইফুর রহমান বলেন, শুধু খাদ্য নয়, শ্রমিক ব্যয় এবং খামার পরিচালনার সামগ্রিক খরচও এবার অনেক বেড়েছে। প্রতি বছর তিনি ২০ থেকে ৩০টি গরু প্রস্তুত করেন। কিন্তু এবার গরু পালনের খরচ অনেক বেশি হওয়ায় লাভ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সীমান্ত নিয়ে বাড়তি সতর্কতা
সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশের আশঙ্কাও রয়েছে খামারিদের মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকলে স্থানীয় বাজারে দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং দেশীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ডা. গৌরাঙ্গ কুমার তালুকদার বলেন, খামারিদের উৎপাদন খরচ কমাতে এবং প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণে উদ্বুদ্ধ করতে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও ভেটেরিনারি সেবা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু প্রবেশ ঠেকাতে প্রশাসন ও বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
নওগাঁ ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর শফিক জানান, জেলার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় ৩৬টি বিওপিকে সার্বক্ষণিক টহল ও নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার আশা, ঈদের আগে ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ রোধ করা সম্ভব হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















