কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের দ্রুত বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত সরবরাহ ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক তামার বাজারে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জল্পনামূলক অর্থ প্রবাহে লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে তামার দাম আবারও রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
বুধবার লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে তিন মাস মেয়াদি তামার ফিউচার চুক্তির দাম দাঁড়ায় প্রতি মেট্রিক টনে ১৩ হাজার ৬৫৫ ডলার ৫০ সেন্ট। মার্চের শেষদিকে ইরান যুদ্ধ ঘিরে বৈশ্বিক বাজারে ঝুঁকিবিমুখ মনোভাবের সময় যে নিম্নমুখী অবস্থান তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে দাম প্রায় ২০ শতাংশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ১৩ মে দাম উঠেছিল ১৪ হাজার ১৯৬ ডলার ৫০ সেন্টে, যা জানুয়ারিতে গড়া সর্বোচ্চ রেকর্ডের খুব কাছাকাছি।
এআই খাতের প্রসারে তামার চাহিদা
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বাড়ছে এবং এসব স্থাপনায় বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক তার ব্যবহৃত হওয়ায় তামার চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। মরগান স্ট্যানলির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ডেটা সেন্টারের জন্য তামার চাহিদা যেখানে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার টন, ২০২৮ সালের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় ১৩ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।
এই সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীরা তামার ফিউচার বাজারে বড় অঙ্কের অর্থ ঢালছেন। একই সঙ্গে এআই-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারমূল্যও বাড়ছে, যা ধাতব বাজারে আরও আশাবাদ তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে নতুন সরবরাহ ঝুঁকি
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সালফার ও সালফিউরিক অ্যাসিড সরবরাহ নিয়ে। তামা গলানোর প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ সালফিউরিক অ্যাসিড প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে চিলি ও কঙ্গোর মতো প্রধান উৎপাদনকারী দেশে এই উপাদানের গুরুত্ব অনেক বেশি।
বিশ্বের মোট সালফার রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির কার্যত অচলাবস্থা এবং চীনের নিজস্ব বাজারকে অগ্রাধিকার দিয়ে মে মাস থেকে সালফার রপ্তানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা বেড়েছে।
টয়োটা সুশো মেটালস জাপানের কর্মকর্তা কানজি তাজিমা বলেন, সালফিউরিক অ্যাসিড সরবরাহে অনিশ্চয়তা তামা উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন উদ্বেগ বাড়ছে।

খনি উৎপাদনেও চাপ
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তামা খনি ইন্দোনেশিয়ার গ্রাসবার্গ খনিতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাদাধসের ঘটনায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে উৎপাদন সক্ষমতা ৮৫ শতাংশে ফেরার আশা করা হলেও এপ্রিলের শেষদিকে সেই পূর্বাভাস কমিয়ে প্রায় ৬৫ শতাংশে নামানো হয়েছে।
অন্যদিকে, পানামার কোব্রে পানামা খনি ২০২৩ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। একসময় এই খনি বৈশ্বিক উৎপাদনের ১ শতাংশের বেশি সরবরাহ করত। পাশাপাশি পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও খনন ব্যয়ের কারণে নতুন খনি উন্নয়নও কঠিন হয়ে উঠছে।
মিজুহো ব্যাংকের পরিচালক কাজুতোমো নোমুরা বলেন, গ্রাসবার্গ খনির বিলম্বিত পুনরুদ্ধার আবারও আকরিক সংকটের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
জল্পনামূলক অর্থের প্রভাব
চাহিদা বৃদ্ধি ও সরবরাহ ঝুঁকির এই দ্বৈত পরিস্থিতিতে জল্পনামূলক বিনিয়োগ দ্রুত বেড়েছে। ১৫ মে পর্যন্ত এলএমইতে ফান্ডগুলোর নেট লং পজিশন ছিল প্রায় ৪০ হাজার, যা দেড় মাস আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
তবে বাস্তব বাজারে এখনো বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা যায়নি। এলএমই গুদামে তামার মজুত ৪ লাখ টনের কাছাকাছি, যা ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বাস্তব অর্থনীতিতে শক্তিশালী চাহিদার ইঙ্গিত ছাড়া নতুন রেকর্ড গড়া কঠিন হতে পারে।
বিশ্ববাজারে তামার দাম বাড়লেও বড় গলনকারী কোম্পানিগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সুমিতোমো মেটাল মাইনিং ২০২৬ অর্থবছরের জন্য প্রতি টন তামার দাম ১১ হাজার ডলার ধরে হিসাব করছে। কোম্পানিটির মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বছরের শেষ দিকে দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















