১০:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬
মতভেদ থেকে তাকফির: ধর্মের ব্যাখ্যা যখন সহিংসতার অস্ত্রে পরিণত হয় সৌদি আরবের উন্নয়নের নতুন মানদণ্ড: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি শুধু প্রযুক্তি, নাকি রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরীক্ষা? জীবাণু অস্ত্রের নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়, নতুন হুমকি বায়োসন্ত্রাস কোরিয়ার ছোঁয়ায় নতুন স্বাদের ইনারি-সুশি: ভুট্টা, টোফু আর ঝাল মাখনের অনন্য মেলবন্ধন উত্তর কোরিয়া-রাশিয়ার সামরিক জোটে বদলে যাচ্ছে ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তা সমীকরণ টানা পঞ্চম মাসে টয়োটার বৈশ্বিক বিক্রি কমল, চাপ বাড়ছে গাড়ি শিল্পে ইরানকে থামাতে পারবে কি চীন? উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষা বিমসটেককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নেপাল, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে নতুন উদ্যোগ ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কুমামোতো, ফিরছে পরিবহন ও শিল্প কার্যক্রম পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিন প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে ঢুকে পড়ল অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল

পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ ঘিরে স্পেনে নতুন বিতর্ক, যুদ্ধের ক্ষত আবারও আলোচনায়

স্পেনের গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি বহন করা পাবলো পিকাসোর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘গুয়ের্নিকা’কে ঘিরে আবারও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে স্পেনে। আগামী বছর এই বোমা হামলার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চিত্রকর্মটি কোথায় প্রদর্শিত হবে, তা নিয়ে দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

১৯৩৭ সালের ২৬ এপ্রিল স্পেনের বাস্ক অঞ্চলের ছোট শহর গুয়ের্নিকায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় নাৎসি জার্মানি ও ইতালির বিমানবাহিনী। তারা তখন স্পেনের জাতীয়তাবাদী নেতা ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর মিত্র ছিল। বাজারের দিনে টানা তিন ঘণ্টার বোমা হামলায় শহরটির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। অসংখ্য সাধারণ মানুষ নিহত হন, যদিও সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা আজও অজানা।

যুদ্ধের বিভীষিকার প্রতীক

এই হামলার পরপরই শিল্পী পাবলো পিকাসো তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘গুয়ের্নিকা’ আঁকেন। তখন তিনি প্যারিস আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর জন্য একটি বড় দেয়ালচিত্র তৈরির কাজ করছিলেন। হামলার খবর পেয়ে তিনি নতুনভাবে কাজ শুরু করেন এবং মাত্র এক মাসের মধ্যেই তৈরি করেন যুদ্ধবিরোধী ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী শিল্পকর্ম।

চিত্রকর্মটিতে যুদ্ধের আতঙ্ক, মৃত্যু, ভয় এবং মানুষের অসহায়ত্ব এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা সময়ের সীমা পেরিয়ে আজও বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

স্পেনে ফেরার দীর্ঘ অপেক্ষা

পিকাসো চেয়েছিলেন, ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই চিত্রকর্ম স্পেনে ফিরবে না। সেই কারণে বহু বছর বিদেশে থাকার পর ১৯৮১ সালে ‘গুয়ের্নিকা’ স্পেনে আনা হয়। প্রথমদিকে এটি মাদ্রিদের প্রাদো জাদুঘরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছিল। পরে সেটি স্থানান্তর করা হয় রেইনা সোফিয়া জাদুঘরে, যেখানে এখনও এটি সংরক্ষিত আছে।

বর্তমানে চিত্রকর্মটির অবস্থা বেশ নাজুক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাই বহু বছর ধরেই এটিকে অন্য কোথাও নেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।

Tapestry replica of Picasso's anti-war masterpiece Guernica removed from  United Nations headquarters after 35 years - The Art Newspaper -  International art news and events

নতুন করে কেন বিতর্ক

বাস্ক সরকার চেয়েছিল, গুয়ের্নিকা হামলার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিলবাওয়ের গুগেনহেইম জাদুঘরে বিশেষ প্রদর্শনীতে কিছু সময়ের জন্য চিত্রকর্মটি আনা হোক। কারণ বিলবাও শহরটি গুয়ের্নিকার খুব কাছেই অবস্থিত।

কিন্তু স্পেনের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে, সংরক্ষণের ঝুঁকির কারণে এই অনুরোধ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। সরকারের মতে, এত পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম সরানো হলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি নিরাপদে রাখা সবচেয়ে জরুরি।

এই সিদ্ধান্তের পর স্পেনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—গুয়ের্নিকার মতো একটি শিল্পকর্ম কি রাজধানী মাদ্রিদেই থাকবে, নাকি সেটিকে সেই অঞ্চলে নেওয়া উচিত, যেখানে সেই ট্র্যাজেডি ঘটেছিল।

যুদ্ধের স্মৃতি এখনো জীবন্ত

স্পেনের মানুষের কাছে ‘গুয়ের্নিকা’ শুধু একটি ছবি নয়, বরং দেশের বিভক্ত ইতিহাসের প্রতীক। গৃহযুদ্ধের সময় পরিবার ভেঙেছে, অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং সমাজে তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষত। সেই স্মৃতি এখনও অনেকের কাছে সংবেদনশীল ও কষ্টের বিষয়।

বিশ্বজুড়ে এই চিত্রকর্ম এখন যুদ্ধবিরোধী প্রতীকে পরিণত হলেও স্পেনের মানুষের কাছে এটি তাদের নিজস্ব ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। একটি শহরের নাম, একটি ভয়াবহ হামলা এবং একটি চিত্রকর্ম—সব মিলিয়ে ‘গুয়ের্নিকা’ আজও যুদ্ধের নির্মমতার সবচেয়ে শক্তিশালী স্মারকগুলোর একটি।

পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ ঘিরে স্পেনে নতুন বিতর্ক, ৯০ বছর পরও গৃহযুদ্ধের ক্ষত নিয়ে চলছে আলোচনা।

জনপ্রিয় সংবাদ

মতভেদ থেকে তাকফির: ধর্মের ব্যাখ্যা যখন সহিংসতার অস্ত্রে পরিণত হয়

পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ ঘিরে স্পেনে নতুন বিতর্ক, যুদ্ধের ক্ষত আবারও আলোচনায়

০৮:১৩:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬

স্পেনের গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি বহন করা পাবলো পিকাসোর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘গুয়ের্নিকা’কে ঘিরে আবারও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে স্পেনে। আগামী বছর এই বোমা হামলার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চিত্রকর্মটি কোথায় প্রদর্শিত হবে, তা নিয়ে দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

১৯৩৭ সালের ২৬ এপ্রিল স্পেনের বাস্ক অঞ্চলের ছোট শহর গুয়ের্নিকায় ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় নাৎসি জার্মানি ও ইতালির বিমানবাহিনী। তারা তখন স্পেনের জাতীয়তাবাদী নেতা ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর মিত্র ছিল। বাজারের দিনে টানা তিন ঘণ্টার বোমা হামলায় শহরটির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। অসংখ্য সাধারণ মানুষ নিহত হন, যদিও সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা আজও অজানা।

যুদ্ধের বিভীষিকার প্রতীক

এই হামলার পরপরই শিল্পী পাবলো পিকাসো তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘গুয়ের্নিকা’ আঁকেন। তখন তিনি প্যারিস আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর জন্য একটি বড় দেয়ালচিত্র তৈরির কাজ করছিলেন। হামলার খবর পেয়ে তিনি নতুনভাবে কাজ শুরু করেন এবং মাত্র এক মাসের মধ্যেই তৈরি করেন যুদ্ধবিরোধী ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী শিল্পকর্ম।

চিত্রকর্মটিতে যুদ্ধের আতঙ্ক, মৃত্যু, ভয় এবং মানুষের অসহায়ত্ব এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা সময়ের সীমা পেরিয়ে আজও বিশ্বজুড়ে মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

স্পেনে ফেরার দীর্ঘ অপেক্ষা

পিকাসো চেয়েছিলেন, ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই চিত্রকর্ম স্পেনে ফিরবে না। সেই কারণে বহু বছর বিদেশে থাকার পর ১৯৮১ সালে ‘গুয়ের্নিকা’ স্পেনে আনা হয়। প্রথমদিকে এটি মাদ্রিদের প্রাদো জাদুঘরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছিল। পরে সেটি স্থানান্তর করা হয় রেইনা সোফিয়া জাদুঘরে, যেখানে এখনও এটি সংরক্ষিত আছে।

বর্তমানে চিত্রকর্মটির অবস্থা বেশ নাজুক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাই বহু বছর ধরেই এটিকে অন্য কোথাও নেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।

Tapestry replica of Picasso's anti-war masterpiece Guernica removed from  United Nations headquarters after 35 years - The Art Newspaper -  International art news and events

নতুন করে কেন বিতর্ক

বাস্ক সরকার চেয়েছিল, গুয়ের্নিকা হামলার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিলবাওয়ের গুগেনহেইম জাদুঘরে বিশেষ প্রদর্শনীতে কিছু সময়ের জন্য চিত্রকর্মটি আনা হোক। কারণ বিলবাও শহরটি গুয়ের্নিকার খুব কাছেই অবস্থিত।

কিন্তু স্পেনের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে, সংরক্ষণের ঝুঁকির কারণে এই অনুরোধ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। সরকারের মতে, এত পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম সরানো হলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি নিরাপদে রাখা সবচেয়ে জরুরি।

এই সিদ্ধান্তের পর স্পেনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—গুয়ের্নিকার মতো একটি শিল্পকর্ম কি রাজধানী মাদ্রিদেই থাকবে, নাকি সেটিকে সেই অঞ্চলে নেওয়া উচিত, যেখানে সেই ট্র্যাজেডি ঘটেছিল।

যুদ্ধের স্মৃতি এখনো জীবন্ত

স্পেনের মানুষের কাছে ‘গুয়ের্নিকা’ শুধু একটি ছবি নয়, বরং দেশের বিভক্ত ইতিহাসের প্রতীক। গৃহযুদ্ধের সময় পরিবার ভেঙেছে, অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং সমাজে তৈরি হয়েছে গভীর ক্ষত। সেই স্মৃতি এখনও অনেকের কাছে সংবেদনশীল ও কষ্টের বিষয়।

বিশ্বজুড়ে এই চিত্রকর্ম এখন যুদ্ধবিরোধী প্রতীকে পরিণত হলেও স্পেনের মানুষের কাছে এটি তাদের নিজস্ব ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। একটি শহরের নাম, একটি ভয়াবহ হামলা এবং একটি চিত্রকর্ম—সব মিলিয়ে ‘গুয়ের্নিকা’ আজও যুদ্ধের নির্মমতার সবচেয়ে শক্তিশালী স্মারকগুলোর একটি।

পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’ ঘিরে স্পেনে নতুন বিতর্ক, ৯০ বছর পরও গৃহযুদ্ধের ক্ষত নিয়ে চলছে আলোচনা।