০৭:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, আড়াই মিলিয়ন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য শেরপুরে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব, গাছচাপায় প্রাণ গেল বৃদ্ধার সোলার প্যানেলের কর প্রত্যাহারের দাবিতে চট্টগ্রামে পদযাত্রা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক বানানোর লক্ষ্য, বললেন রাজনাথ সিং মোদিকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ দিলেন মার্কো রুবিও, দিল্লিতে জোরালো হলো ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত আলোচনা ক্যানসার, মৃত্যুভয় ও বিশ্বাসের পুনর্জন্ম ডিজিটাল খ্যাতির বাজারে সত্যের সংকট ইন্দোনেশিয়ায় মার্কিন হারকিউলিস হাব পরিকল্পনা ঘিরে সার্বভৌমত্ব বিতর্ক ব্রিটেনের পূর্ব উপকূল কেন পরিযায়ী পাখির ‘আকাশপথের মহাসড়ক’ গাছের বলয়ে লুকানো জলবায়ুর ইতিহাস, ভবিষ্যতের আবহাওয়ার সংকেতও মিলছে গবেষণায়

গাছের বলয়ে লুকানো জলবায়ুর ইতিহাস, ভবিষ্যতের আবহাওয়ার সংকেতও মিলছে গবেষণায়

মানুষের সভ্যতা, জলবায়ু আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গাছ এখন হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত দলিল। হাজার বছরের পুরোনো বৃক্ষের কাণ্ডে তৈরি হওয়া বলয় বা রিং বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করছেন অতীতের খরা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, এমনকি মহামারির মতো সামাজিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিতও। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বুঝতেও গাছের এই বলয় গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা জানতেন, প্রতি বছর গাছের কাণ্ডে নতুন একটি বলয় তৈরি হয়। আবহাওয়ার অনুকূলতা অনুযায়ী কখনও সেই বলয় মোটা হয়, কখনও সরু। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এখন সেই বলয় বিশ্লেষণ আরও সূক্ষ্ম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিজ্ঞানীরা শুধু বলয়ের প্রস্থ নয়, কাঠের কোষের আকার, ঘনত্ব ও দেয়ালের গঠন পর্যন্ত পরীক্ষা করছেন। এর মাধ্যমে হাজার বছরের জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিক তথ্য পুনর্গঠন করা সম্ভব হচ্ছে।

জলবায়ুর গোপন ভাষা

বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ভ্যালেরি ত্রুয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রি-রিং গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের গাছের বলয় নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো উত্তর আটলান্টিকের জেট স্ট্রিম বা উচ্চ বায়ুপ্রবাহের গতিপথ কীভাবে ইউরোপের আবহাওয়াকে শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রভাবিত করেছে।

ত্রুয়ে ও তাঁর সহকর্মীরা স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্ম অঞ্চলের স্কটস পাইন এবং বলকান অঞ্চলের বসনিয়ান পাইন গাছের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। সেখানে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালে বলকান অঞ্চলের গাছের বলয় ছিল অস্বাভাবিক সরু, যা ঠান্ডা গ্রীষ্মের ইঙ্গিত দেয়। অথচ একই বছরে ব্রিটেনে ছিল ভয়াবহ গরম ও খরা। এই বিপরীতধর্মী আবহাওয়াকে বিজ্ঞানীরা “ক্লাইমেট ডাইপোল” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

গবেষকদের মতে, জেট স্ট্রিমের অবস্থান বদলালে ইউরোপের এক অঞ্চলে তাপপ্রবাহ দেখা দেয়, অন্য অঞ্চলে নেমে আসে ঠান্ডা ও বৃষ্টি। গাছের বলয় বিশ্লেষণ করে তাঁরা গত ৭০০ বছরের জেট স্ট্রিমের পরিবর্তনের ইতিহাস পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন।

অতীতের দুর্ভিক্ষ থেকে মহামারি

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জেট স্ট্রিমের অবস্থান শুধু আবহাওয়াই নয়, মানুষের জীবনযাত্রা ও সমাজকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ইউরোপে যখন নির্দিষ্ট অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্র আবহাওয়া তৈরি হয়েছে, তখন সেখানে প্লেগের মতো রোগ দ্রুত ছড়িয়েছে। অন্যদিকে খরা ও শীতল আবহাওয়া বহু সময় দুর্ভিক্ষের কারণ হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার বিশাল সিকোয়িয়া ও ডগলাস ফার গাছ নিয়েও গবেষণা করেছেন ত্রুয়ে। সেই গবেষণায় জানা গেছে, উনিশ শতকের আগে ওই অঞ্চলের বনভূমিতে প্রতি পাঁচ থেকে পনেরো বছর পরপর প্রাকৃতিক আগুন লাগত। পরে দীর্ঘদিন আগুন দমন করার ফলে বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যায় এবং বর্তমানে দাবানল আরও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।

হাজার বছরের জীবন্ত আর্কাইভ

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী গাছগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ওক, কিলিয়ান জুনিপার এবং গ্রেট বেসিন ব্রিসলকোন পাইন। কিছু গাছের বয়স পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি। বিজ্ঞানীদের মতে, এসব গাছ শুধু অতীতের তথ্য সংরক্ষণ করে না, বরং পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, দাবানল, বন উজাড় ও রোগবালাইয়ের কারণে এখন এই প্রাচীন বৃক্ষগুলোও হুমকির মুখে পড়েছে।

ত্রুয়ের ভাষায়, গাছ কেবল প্রকৃতির অংশ নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। তাই এই গাছগুলোর সংরক্ষণ মানে শুধু বন রক্ষা নয়, মানবসভ্যতার অতীত ও ভবিষ্যতের তথ্যভান্ডারও রক্ষা করা।

গাছের বলয় বিশ্লেষণে মিলছে জলবায়ুর ইতিহাস ও ভবিষ্যতের সংকেত

গাছের বলয় বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অতীতের আবহাওয়া, খরা, দাবানল ও জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্য উদ্ধার করছেন।

জলবায়ুর পরিবর্তন বুঝতে গাছ এখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাকৃতিক আর্কাইভগুলোর একটি। হাজার বছরের পুরোনো বৃক্ষের বলয় থেকে উঠে আসছে পৃথিবীর আবহাওয়ার বিস্ময়কর ইতিহাস।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, আড়াই মিলিয়ন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য

গাছের বলয়ে লুকানো জলবায়ুর ইতিহাস, ভবিষ্যতের আবহাওয়ার সংকেতও মিলছে গবেষণায়

০৫:৩৪:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

মানুষের সভ্যতা, জলবায়ু আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গাছ এখন হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত দলিল। হাজার বছরের পুরোনো বৃক্ষের কাণ্ডে তৈরি হওয়া বলয় বা রিং বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করছেন অতীতের খরা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, এমনকি মহামারির মতো সামাজিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিতও। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বুঝতেও গাছের এই বলয় গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা জানতেন, প্রতি বছর গাছের কাণ্ডে নতুন একটি বলয় তৈরি হয়। আবহাওয়ার অনুকূলতা অনুযায়ী কখনও সেই বলয় মোটা হয়, কখনও সরু। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এখন সেই বলয় বিশ্লেষণ আরও সূক্ষ্ম পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিজ্ঞানীরা শুধু বলয়ের প্রস্থ নয়, কাঠের কোষের আকার, ঘনত্ব ও দেয়ালের গঠন পর্যন্ত পরীক্ষা করছেন। এর মাধ্যমে হাজার বছরের জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিক তথ্য পুনর্গঠন করা সম্ভব হচ্ছে।

জলবায়ুর গোপন ভাষা

বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ভ্যালেরি ত্রুয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রি-রিং গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের গাছের বলয় নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো উত্তর আটলান্টিকের জেট স্ট্রিম বা উচ্চ বায়ুপ্রবাহের গতিপথ কীভাবে ইউরোপের আবহাওয়াকে শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রভাবিত করেছে।

ত্রুয়ে ও তাঁর সহকর্মীরা স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্ম অঞ্চলের স্কটস পাইন এবং বলকান অঞ্চলের বসনিয়ান পাইন গাছের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। সেখানে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালে বলকান অঞ্চলের গাছের বলয় ছিল অস্বাভাবিক সরু, যা ঠান্ডা গ্রীষ্মের ইঙ্গিত দেয়। অথচ একই বছরে ব্রিটেনে ছিল ভয়াবহ গরম ও খরা। এই বিপরীতধর্মী আবহাওয়াকে বিজ্ঞানীরা “ক্লাইমেট ডাইপোল” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

গবেষকদের মতে, জেট স্ট্রিমের অবস্থান বদলালে ইউরোপের এক অঞ্চলে তাপপ্রবাহ দেখা দেয়, অন্য অঞ্চলে নেমে আসে ঠান্ডা ও বৃষ্টি। গাছের বলয় বিশ্লেষণ করে তাঁরা গত ৭০০ বছরের জেট স্ট্রিমের পরিবর্তনের ইতিহাস পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন।

অতীতের দুর্ভিক্ষ থেকে মহামারি

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জেট স্ট্রিমের অবস্থান শুধু আবহাওয়াই নয়, মানুষের জীবনযাত্রা ও সমাজকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ইউরোপে যখন নির্দিষ্ট অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্র আবহাওয়া তৈরি হয়েছে, তখন সেখানে প্লেগের মতো রোগ দ্রুত ছড়িয়েছে। অন্যদিকে খরা ও শীতল আবহাওয়া বহু সময় দুর্ভিক্ষের কারণ হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার বিশাল সিকোয়িয়া ও ডগলাস ফার গাছ নিয়েও গবেষণা করেছেন ত্রুয়ে। সেই গবেষণায় জানা গেছে, উনিশ শতকের আগে ওই অঞ্চলের বনভূমিতে প্রতি পাঁচ থেকে পনেরো বছর পরপর প্রাকৃতিক আগুন লাগত। পরে দীর্ঘদিন আগুন দমন করার ফলে বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যায় এবং বর্তমানে দাবানল আরও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।

হাজার বছরের জীবন্ত আর্কাইভ

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী গাছগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ওক, কিলিয়ান জুনিপার এবং গ্রেট বেসিন ব্রিসলকোন পাইন। কিছু গাছের বয়স পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি। বিজ্ঞানীদের মতে, এসব গাছ শুধু অতীতের তথ্য সংরক্ষণ করে না, বরং পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, দাবানল, বন উজাড় ও রোগবালাইয়ের কারণে এখন এই প্রাচীন বৃক্ষগুলোও হুমকির মুখে পড়েছে।

ত্রুয়ের ভাষায়, গাছ কেবল প্রকৃতির অংশ নয়, পৃথিবীর ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। তাই এই গাছগুলোর সংরক্ষণ মানে শুধু বন রক্ষা নয়, মানবসভ্যতার অতীত ও ভবিষ্যতের তথ্যভান্ডারও রক্ষা করা।

গাছের বলয় বিশ্লেষণে মিলছে জলবায়ুর ইতিহাস ও ভবিষ্যতের সংকেত

গাছের বলয় বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অতীতের আবহাওয়া, খরা, দাবানল ও জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্য উদ্ধার করছেন।

জলবায়ুর পরিবর্তন বুঝতে গাছ এখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাকৃতিক আর্কাইভগুলোর একটি। হাজার বছরের পুরোনো বৃক্ষের বলয় থেকে উঠে আসছে পৃথিবীর আবহাওয়ার বিস্ময়কর ইতিহাস।