আর্কটিক অঞ্চল থেকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল পরিযায়ী পাখির পথ ‘ইস্ট আটলান্টিক ফ্লাইওয়ে’ এখন নতুন করে বৈশ্বিক গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ৯ কোটি পাখি এই পথ ধরে যাতায়াত করে। আর সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে ব্রিটেনের পূর্ব উপকূলের জলাভূমি হয়ে উঠেছে তাদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জলাভূমিগুলো শুধু পাখিদের টিকিয়ে রাখছে না, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করছে।
আর্কটিকের বরফ গলতে শুরু করলে সেখানে অস্থায়ীভাবে সৃষ্টি হয় বিপুল খাদ্যসমৃদ্ধ পরিবেশ। সেই সুযোগে শত শত প্রজাতির পাখি সেখানে প্রজননের জন্য ছুটে যায়। কিন্তু শীত ফিরে এলে তারা দক্ষিণে উষ্ণ অঞ্চলের দিকে যাত্রা শুরু করে। এই দীর্ঘ অভিবাসনপথে ব্রিটেনের পূর্ব উপকূলের কাদামাটি অঞ্চল, লবণাক্ত জলাভূমি ও মোহনা হয়ে ওঠে তাদের জ্বালানি ভরার নিরাপদ কেন্দ্র।
বিশেষ করে হাম্বার মোহনা থেকে টেমস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলে এমন নয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে, যেখানে নিয়মিত এক লাখের বেশি পরিযায়ী পাখি আশ্রয় নেয়। শুধু ‘দ্য ওয়াশ’ এলাকাতেই শীতকালে প্রায় পাঁচ লাখ পাখির অবস্থান দেখা যায়। গবেষকদের মতে, গালফ স্ট্রিমের উষ্ণ স্রোতের কারণে এসব জলাভূমি বরফে ঢেকে যায় না, ফলে পাখিরা এখানে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে।

ইউনেস্কো স্বীকৃতির পথে
২০২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রায় ১ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই জলাভূমিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। স্বীকৃতি পেলে অঞ্চলটি গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ বা মাউন্ট কিলিমাঞ্জারোর মতো আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে শুধু জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বই নয়, জলবায়ু মোকাবিলায় প্রকৃতিনির্ভর সুরক্ষাব্যবস্থার মূল্যও বিশ্বজুড়ে আরও স্বীকৃতি পাবে।

কার্বন সংরক্ষণে বড় ভূমিকা
পরিবেশবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোহনা ও লবণাক্ত জলাভূমি বিশাল কার্বন ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এসব লবণাক্ত জলাভূমি পরিপক্ব গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনভূমির তুলনায় দুই থেকে চার গুণ বেশি কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম। ইংল্যান্ডের পূর্ব উপকূলীয় জলাভূমির মাটির ওপরের এক মিটার স্তরেই প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন কার্বন জমা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
শুধু জলবায়ু নয়, সমুদ্রের ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতেও এসব অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওয়ালাসিয়া দ্বীপে আরএসপিবি প্রায় ৬৭০ হেক্টর কৃষিজমিকে আবার জোয়ারভাটা নির্ভর জলাভূমিতে রূপান্তর করেছে। লন্ডনের ক্রসরেইল প্রকল্পের মাটি ব্যবহার করে ভূমি উঁচু করা হয় এবং পুরোনো বাঁধ ভেঙে সমুদ্রের পানি প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। এতে এখন ওই অঞ্চল একদিকে যেমন হাজারো পাখির নিরাপদ আশ্রয়, অন্যদিকে উপকূলীয় জনপদকে ঝড়ের ঢেউ থেকেও রক্ষা করছে।

বাড়ছে হুমকি
তবে এত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষি ও শিল্পায়নের জন্য বিপুল জলাভূমি শুকিয়ে ফেলা হয়েছে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করছেন, নতুন বন্দর নির্মাণ ও জ্বালানি প্রকল্পের চাপ আবারও এই অঞ্চলগুলোর অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশেষ করে ‘দ্য ওয়াশ’ এলাকায় প্রস্তাবিত জোয়ারভাটা নির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু পরিযায়ী পাখি বছরের পর বছর একই জায়গায় ফিরে আসে। ফলে এসব জলাভূমি হারিয়ে গেলে তাদের অভিবাসনচক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ইউনেস্কো স্বীকৃতির অপেক্ষায় না থেকে এখনই কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















