ইউরোপের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে সাত দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করেছে ন্যাটো। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পরিবর্তনে সেই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক মন্তব্য ইউরোপীয় দেশগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছে—প্রয়োজনে কি আমেরিকা সত্যিই ন্যাটোর সদস্যদের রক্ষা করবে?
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের সামনে বিকল্প নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। তবে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে এখনও প্রকাশ্যে এমন আলোচনা নিরুৎসাহিত করে যাচ্ছেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এ অবস্থান বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না।
ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ন্যাটোর মূল প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা মানে পুরো জোটের ওপর হামলা। কিন্তু ট্রাম্প এই প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা কমানোর কথাও বলেছেন তিনি।
এর পরও মার্ক রুটে প্রকাশ্যে বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর প্রতি পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমনকি ন্যাটোর ভেতরে “বিকল্প পরিকল্পনা” নিয়ে আলোচনাও সীমিত করার চেষ্টা করেছেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, রুটে মূলত কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছেন। কারণ ইউরোপ যদি প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিরাপত্তা পরিকল্পনা শুরু করে, তাহলে ট্রাম্প আরও ক্ষুব্ধ হতে পারেন এবং ন্যাটো থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ইউরোপের গোপন প্রস্তুতি
যদিও প্রকাশ্যে সতর্ক ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে গোপনে কাজ শুরু করেছে। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী মন্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে মোতায়েন কিছু সেনা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধের সময় ইউরোপে পাঠানোর জন্য যে সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ছিল, তাতেও কাটছাঁটের ইঙ্গিত মিলেছে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হচ্ছে অস্ত্র সরবরাহ। ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কিনলেও সেগুলোর সরবরাহ নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সামরিক মজুত পুনর্গঠনে ব্যস্ত।

ইউরোপের সামনে কী পথ খোলা?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। একটি হলো ন্যাটোকেই ধীরে ধীরে আরও “ইউরোপকেন্দ্রিক” করে তোলা। আরেকটি পথ হতে পারে নতুন সামরিক জোট গঠন।
ইতোমধ্যে ব্রিটেনের নেতৃত্বে গঠিত যৌথ অভিযাত্রী বাহিনী এবং ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য তৈরি “ইচ্ছুক দেশগুলোর জোট” নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
তবে এসব উদ্যোগ ঝুঁকিমুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্ব ছাড়া ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কে সিদ্ধান্ত নেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
তারপরও অনেকের মতে, এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কোনো প্রস্তুতি না নেওয়া। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















