বেলুচিস্তানের খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলকে ঘিরে বাড়তে থাকা জঙ্গি হামলার মধ্যে নতুন নিরাপত্তা পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে পাকিস্তান সরকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, খনিজ সম্পদ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন একটি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হবে। একই সঙ্গে বেলুচিস্তানের রাখশান বিভাগে গড়ে তোলা হবে বিশেষ নিরাপত্তা করিডর।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে খনিজসম্পদভিত্তিক বড় প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন ইসলামাবাদের প্রধান লক্ষ্য।
রাখশান কেন গুরুত্বপূর্ণ
রাখশান বিভাগ পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক অঞ্চলগুলোর একটি। আয়তনে এটি দক্ষিণ কোরিয়ার কাছাকাছি। অঞ্চলটি ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
এই এলাকাতেই অবস্থিত রেকো দিক তামা ও স্বর্ণখনি প্রকল্প, যা পরিচালনা করছে কানাডাভিত্তিক ব্যারিক মাইনিং। পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ খনিজ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত এই খনি আগামী ৩৭ বছরে ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এলাকাটিতে জঙ্গি হামলা ও নাশকতা বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান হামলা ও নিরাপত্তা সংকট
গত কয়েক মাসে রাখশানে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এপ্রিল মাসে একটি খনিশিল্প এলাকায় হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে একজন বিদেশি নাগরিকও ছিলেন। হামলার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল রিসোর্সেসের একটি খনি প্রকল্প।
এরপর মে মাসে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খনিজবাহী ট্রাকে আগুন দেওয়া, সরবরাহ যানবাহনে হামলা এবং একটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো ঘটনাও ঘটে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই মার্চ মাসে ব্যারিক মাইনিং এক বছরের জন্য রেকো দিক প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। প্রতিষ্ঠানটি অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।

বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা
পাকিস্তানের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক খনিজ বিনিয়োগ ফোরাম আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নতুন বাহিনী গঠন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের আশ্বাস হিসেবে কাজ করবে বলেও মনে করছে ইসলামাবাদ।
যদিও নতুন বাহিনীর সদস্যসংখ্যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে এটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের অধীনে পরিচালিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বেলুচিস্তান নিয়ে গবেষণা করা বিশ্লেষক ইমতিয়াজ বেলুচ মনে করেন, বৈশ্বিকভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নজর এখন আরও বেশি রাখশান অঞ্চলে। তার মতে, জঙ্গিরা এখন শুধু প্রতীকী হামলায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বাণিজ্যপথে নিজেদের উপস্থিতি জোরালোভাবে দেখানোর কৌশল নিয়েছে।
করাচিভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অধ্যাপক ফারহান হানিফ সিদ্দিকী বলেন, ভারত ও আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে না পারলে পাকিস্তানের পক্ষে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংকটে পুরো মনোযোগ দেওয়া কঠিন হবে।
এদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, বেলুচিস্তানের খনিজ প্রকল্পগুলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের মতো ধীরগতির সমস্যায় পড়তে পারে। নিরাপত্তা হুমকির কারণে সিপিইসি সংশ্লিষ্ট অনেক প্রকল্প গত কয়েক বছরে মন্থর হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মুহাম্মদ তাইয়্যাব সাফদার বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে খনিজ প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তার মতে, চলমান সহিংসতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
খনিজ সম্পদ নিরাপত্তা বাহিনী
বেলুচিস্তানের খনিজ প্রকল্প রক্ষায় নতুন বাহিনী গঠনের ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। বাড়তি জঙ্গি হামলার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
পাকিস্তানের খনিজ নিরাপত্তা বাহিনী গঠন নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত। বেলুচিস্তানে জঙ্গি হামলা বাড়ায় বিদেশি বিনিয়োগ ও রেকো দিক প্রকল্প নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















