মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে পাম অয়েল, আখ, ভুট্টা, ক্যাসাভা ও নারকেলের মতো কৃষিপণ্য এখন বেশি করে ব্যবহার হচ্ছে বায়োফুয়েল তৈরিতে। তবে এই পরিবর্তনের কারণে খাদ্যতেল, পশুখাদ্য ও কৃষিপণ্য রপ্তানি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে জ্বালানিতে স্থানীয় কৃষিপণ্য মেশানোর বাধ্যতামূলক হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালির কার্যত অচলাবস্থার পর দেশগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নেমেছে।
ইন্দোনেশিয়ার বড় পরিকল্পনা
এশিয়ার সবচেয়ে বড় পাম অয়েল উৎপাদক ইন্দোনেশিয়া সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে ডিজেলে ৪০ শতাংশ পাম অয়েল মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। আগামী জুলাই থেকে তা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বড় পরিসরে এগোচ্ছে ইন্দোনেশিয়া।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন নীতির ফলে চলতি বছর ডিজেল আমদানি ব্যয়ে প্রায় ৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৯০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
তবে উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে দেশটির ২৬টি রিফাইনারির মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডেও চাপ
মালয়েশিয়া জুন থেকে জাতীয়ভাবে ডিজেলে বায়োফুয়েলের হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করছে। ভবিষ্যতে তা ২০ শতাংশ বা আরও বেশি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কিন্তু দেশটির পাম অয়েল খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ মিশ্রণের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল, অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। অতিরিক্ত পাম অয়েল সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে অন্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
থাইল্যান্ডে ইতোমধ্যে ভোজ্যতেলের বাজারে চাপ দেখা যাচ্ছে। দেশটির কিছু খুচরা দোকান রান্নার তেল কেনায় সীমা বেঁধে দিয়েছে। সরকার পাম অয়েল রপ্তানির ওপরও নজরদারি বাড়িয়েছে।
দাম বাড়ার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, পাম অয়েলের বৈশ্বিক দাম বাড়তে থাকলে ইন্দোনেশিয়ায় রান্নার তেলের দাম প্রতি লিটারে ১ হাজার থেকে ২ হাজার রুপিয়াহ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়বে ছোট খাবারের দোকান, ভাজাপোড়ার ব্যবসা ও সাধারণ পরিবারের ওপর।
এছাড়া বায়োফুয়েলের জন্য বেশি পাম অয়েল ধরে রাখায় রপ্তানিও কমতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইন্দোনেশিয়াকে বছরে ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন টন পাম অয়েল রপ্তানি থেকে সরিয়ে রাখতে হতে পারে, যা দেশটির মোট রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশ।
যানবাহনের মালিকদের উদ্বেগ
শুধু খাদ্য বা রপ্তানি নয়, যানবাহনের মালিকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। ইন্দোনেশিয়ার কিছু শিল্পখাত বলছে, উচ্চমাত্রার বায়োফুয়েল ব্যবহারে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ভিয়েতনামেও চালকদের মধ্যে অনীহা রয়েছে। দেশটি এখন ই-১০ জ্বালানি চালুর পথে। তবে অনেক চালক মনে করছেন, বেশি ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ইঞ্জিনের ক্ষতি করতে পারে।
ফিলিপাইনে নারকেলভিত্তিক বায়োডিজেল উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও কৃষক সংগঠনগুলো বলছে, পুরোনো গাছ ও কম উৎপাদনের কারণে অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করা কঠিন হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এখন দ্রুত বায়োফুয়েলের দিকে এগোলেও, খাদ্য নিরাপত্তা, রপ্তানি আয় ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নতুন ভারসাম্যের প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















