এক সময়ের জনপ্রিয় স্মার্টফোন নির্মাতা কানাডিয়ান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকবেরি এখন নিজেদের নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করছে সাইবার নিরাপত্তা ও অটোমোটিভ সফটওয়্যার খাতে। এশিয়ার বাজারে অবস্থান আরও শক্ত করতে প্রতিষ্ঠানটি এবার মালয়েশিয়াকে আঞ্চলিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছে।
কুয়ালালামপুরের কাছে নিজেদের আঞ্চলিক সদর দপ্তর সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্ল্যাকবেরি সেখানে একটি সাইবার নিরাপত্তা উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। মালয়েশিয়ার কমিউনিকেশনস অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া কমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে গড়া এই কেন্দ্রের পাশাপাশি ৫০ জনের বেশি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি সহায়তা কেন্দ্রও চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাড়ছে ডিজিটাল নির্ভরতা
ব্ল্যাকবেরির প্রধান নির্বাহী জন জিয়ামাত্তেও জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিস্তার কোম্পানিটির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, শুধু উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই হবে না, স্থানীয় অংশীদারদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কও জরুরি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের সরকার এখন তাদের তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে এবং কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—এসব বিষয় নিয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। ফলে এমন প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ছে, যা সরকারের নিজস্ব তথ্য নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে সহায়তা করবে।
এই পরিস্থিতিকে ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবে দেখছে ব্ল্যাকবেরি। প্রতিষ্ঠানটি তাদের এনক্রিপটেড যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন-প্রিমাইস ডেটা ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কাছে তুলে ধরছে।
বাণিজ্যিক অ্যাপ ব্যবহারে ঝুঁকি
জন জিয়ামাত্তেওর মতে, বিশ্বের বহু সরকারি কর্মকর্তা এখনও সংবেদনশীল যোগাযোগের জন্য সাধারণ বাণিজ্যিক মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করছেন, যা নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি বলেন, সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এসব অ্যাপ হয়তো যথেষ্ট, কিন্তু সরকার বা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকির মাত্রা ভিন্ন। তাই নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন বাড়ছে।
গত বছর কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আসিয়ান সম্মেলনে ব্ল্যাকবেরির নিরাপদ যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম অ্যাটহক ও সিকিউসুইট ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তারা নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচল নজরদারি এবং গোপন বার্তা আদান-প্রদান করতে সক্ষম হন।

গাড়ির সফটওয়্যারেও বড় পরিকল্পনা
সাইবার নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্ল্যাকবেরি তাদের অটোমোটিভ সফটওয়্যার কিউএনএক্স নিয়েও বড় পরিকল্পনা করছে। কোম্পানির দাবি, বিশ্বজুড়ে ২৭ কোটি ৫০ লাখের বেশি গাড়িতে এই সফটওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রতিবছর উৎপাদিত প্রায় ৯ কোটি গাড়ির মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশে উন্নত নিরাপত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় গাড়ি প্রযুক্তি ও আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহারের কারণে এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্ল্যাকবেরি জানিয়েছে, তারা চিপ নির্মাতা ও গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছে যাতে নতুন প্রযুক্তি দ্রুত বাজারে আনা যায়।
মালয়েশিয়ার বাড়তি গুরুত্ব
যদিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখনও ব্ল্যাকবেরির প্রধান প্রকৌশল কেন্দ্র নয়, তবে অঞ্চলটি প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বাজার সম্ভাবনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে মালয়েশিয়ার অটোমোবাইল খাত এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে দেশটি ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গাড়ির বাজারে পরিণত হয়েছে। বছরে সেখানে ৮ লাখ ২০ হাজারের বেশি গাড়ি বিক্রি হয়েছে।
ব্ল্যাকবেরির মতে, মালয়েশিয়ায় ঘাঁটি গড়ে তোলার ফলে তারা স্থানীয় প্রযুক্তি ও শিল্প ইকোসিস্টেমের সুবিধা নিতে পারবে এবং বিভিন্ন দেশের বাজার অনুযায়ী আলাদা কৌশলও প্রয়োগ করতে পারবে।
চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্ল্যাকবেরির মোট আয় ছিল ৫৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশ এসেছে উত্তর আমেরিকা থেকে, আর ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চল থেকে এসেছে ৩৫ শতাংশ আয়।
ব্ল্যাকবেরির মালয়েশিয়া সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাইবার নিরাপত্তা ও অটোমোটিভ সফটওয়্যার ব্যবসা বাড়াতে মালয়েশিয়াকে আঞ্চলিক ঘাঁটি করছে ব্ল্যাকবেরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















