জাপানের অ্যানিমে শিল্পে এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন বিদেশি শিল্পীরা। দেশটির জনপ্রিয় অ্যানিমেশন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু জাপানি কর্মীদের ওপর নির্ভর না করে বিদেশ থেকে আসা প্রশিক্ষিত শিল্পীদেরও কাজে লাগাচ্ছে। একই সঙ্গে এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত করতেও বড় ভূমিকা রাখছেন তারা।
২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া পরিচালক মাকোতো শিনকাই-এর জনপ্রিয় অ্যানিমে চলচ্চিত্র ‘সুজুমে’-তে কাজ করেছিলেন রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া অ্যানিমেটর আনিতা কিম। ছোটবেলায় ‘নারুতো’-র মতো সিরিজ দেখে অ্যানিমের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। পরে নিজ দেশে জাপানি ভাষা শেখার পর ২০১৪ সালে জাপানে যান। ভাষা শিক্ষা ও অ্যানিমেশন স্কুলে পড়াশোনা শেষে ২০১৭ সালে টোকিওভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোমিক্স ওয়েভ ফিল্মস-এ যোগ দেন তিনি।
আনিতা কিমের ভাষায়, জাপানি অ্যানিমেশনের মূল আকর্ষণ হলো হাতে আঁকার শিল্পে ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যের প্রকাশ। বর্তমানে স্বাধীনভাবে কাজ করলেও এখনও জাপানের বিভিন্ন অ্যানিমে প্রকল্পে যুক্ত আছেন তিনি।
![]()
বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ার কারণ
জাপানের অ্যানিমেশন শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ জনবল সংকটে ভুগছে। জাপান অ্যানিমেশন ক্রিয়েটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শিল্পটিতে কর্মরতদের প্রায় ৪ শতাংশ ছিলেন বিদেশি নাগরিক। মাত্র তিন বছর আগে এই হার ছিল এর অর্ধেক।
একই সময়ে স্বাস্থ্য ও সেবাখাতেও কর্মী সংকট থাকলেও সেখানে বিদেশি কর্মীর হার ছিল ২ শতাংশেরও কম। অ্যানিমেশন শিল্পে কাজ করতে বিশেষ দক্ষতার পাশাপাশি উচ্চমানের জাপানি ভাষাজ্ঞান প্রয়োজন হওয়ায় বিদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও অভিযোজনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাপানি ভাষা শেখায় বাড়ছে আগ্রহ
জাপান ফাউন্ডেশনের এক জরিপ বলছে, ২০২৪ অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৪০ লাখের বেশি মানুষ জাপানি ভাষা শিখেছেন। ২০২১ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ৫ শতাংশ বেড়েছে। ভাষা শেখার কারণ হিসেবে ৬০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী বিনোদন ও অ্যানিমে সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, জাপানের ভেতরে জাপানি ভাষা স্কুলগুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যাও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় এক লাখে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি।
.jpg?width=1260&fit=cover&gravity=faces&dpr=2&quality=medium&source=nar-cms&format=auto&height=630)
বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি
জাপানের বিভিন্ন অ্যানিমেশন স্কুল বলছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার আগ্রহ বেশি এবং ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক কম। তবে এই খাতে এখনও জাতীয় লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নেই। এছাড়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায়ও অ্যানিমেশন শিল্প অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে পূর্ণকালীন চাকরির প্রমাণ ছাড়া কাজের ভিসা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
তারপরও অনেক শিক্ষার্থী এই শিল্পে ক্যারিয়ার গড়তে জাপানে আসছেন। কারণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে এখন নিজ দেশে ফিরে গিয়েও জাপানি অ্যানিমের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শিল্পী ওয়াং ওয়েন লিয়েক টোকিওভিত্তিক ওএলএম ডিজিটাল-এ পাঁচ বছর কাজ করার পর নিজ দেশে ফিরে যান। কিন্তু এখনও অনলাইনে চুক্তিভিত্তিক কাজের মাধ্যমে জাপানি অ্যানিমে প্রকল্পে যুক্ত আছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন বাস্তবতা
বর্তমানে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ৩০০টির বেশি স্টুডিও জাপানি অ্যানিমেশন তৈরির সঙ্গে যুক্ত। এই আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ফলে প্রযোজনা ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা লিম কাহি, যিনি ‘গান্ডাম’ ফ্র্যাঞ্চাইজির পরিচালনায় কাজ করেছেন।
তার মতে, আন্তর্জাতিক দল পরিচালনার ক্ষেত্রে গল্পের ধারা ও দৃশ্যের নির্দেশনা সবাইকে স্পষ্টভাবে বোঝানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাপান সরকারও এখন কনটেন্ট শিল্পকে কৌশলগত খাত হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি-র সরকার ২০৩৩ সালের মধ্যে বিদেশে জাপানি কনটেন্ট বিক্রি তিন গুণ বাড়িয়ে ২০ ট্রিলিয়ন ইয়েনে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। এ জন্য ২০২৫ ও ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে মোট ৫৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জাপানের অ্যানিমে শিল্পে বিদেশি শিল্পী
জাপানের অ্যানিমে শিল্পে বিদেশি শিল্পীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। দক্ষ জনবল সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক শিল্পীদের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে টোকিওর স্টুডিওগুলো।
জাপানের অ্যানিমে শিল্প এখন শুধু দেশীয় প্রতিভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিদেশি শিল্পীদের অংশগ্রহণে এটি আরও বৈশ্বিক রূপ নিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















