নেপালে বন্য বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ জাতীয় জরিপ অনুযায়ী দেশটিতে বর্তমানে বন্য বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২৯, যা ২০২২ সালের ৩৫৫টির তুলনায় অনেক বেশি এবং ২০১০ সালের ১২১টির প্রায় চার গুণ। মঙ্গলবার ১৭তম গ্লোবাল টাইগার ডে উপলক্ষে এই তথ্য প্রকাশ করেছে নেপাল সরকার।
কাঠমান্ডুতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ‘ন্যাশনাল টাইগার অ্যান্ড প্রে বেস সার্ভে ২০২৬’-এর ফলাফল প্রকাশ করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপ বাস্তবায়ন করে ন্যাশনাল পার্কস অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন বিভাগ এবং ফরেস্টস অ্যান্ড সয়েল কনজারভেশন বিভাগ। এ কাজে সহযোগিতা করে ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর নেচার কনজারভেশন (এনটিএনসি), ডব্লিউডব্লিউএফ নেপাল এবং জেডএসএল নেপাল।
জাতীয় উদ্যানগুলোতে বাঘের অবস্থান
জরিপে দেখা গেছে, চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানে সবচেয়ে বেশি ১৪৫টি বাঘ রয়েছে। এরপর রয়েছে বারদিয়া জাতীয় উদ্যান, যেখানে বাঘের সংখ্যা ১১২। এছাড়া পারসায় ৭১টি, বানকেতে ৫১টি এবং শুক্লাফান্টায় ৫০টি বাঘ শনাক্ত হয়েছে।

২০২২ সালের তুলনায় প্রায় সব জাতীয় উদ্যানে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। তবে বারদিয়ায় ব্যতিক্রম দেখা গেছে। সেখানে বাঘের সংখ্যা ১২৫ থেকে কমে ১১২-এ নেমে এসেছে।
জরিপ কীভাবে পরিচালিত হয়েছে
গবেষকেরা চিতওয়ান-পারসা, বানকে-বারদিয়া এবং শুক্লাফান্টা-লালঝাড়ি অঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ১০০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ স্থাপন করেন। প্রায় ২৫০ জন কর্মী প্রতিটি গ্রিডে অন্তত ১৫ রাত ধরে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে বাঘের ছবি সংগ্রহ করেন। পরে সেই ছবি বিশ্লেষণ করে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্বে বাঘের অবস্থান
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিশ্বে বন্য বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার ২০০। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৫৭-এ।
সবচেয়ে বেশি বন্য বাঘ রয়েছে ভারতে, যার সংখ্যা ৩ হাজার ১৬৭। দ্বিতীয় অবস্থানে রাশিয়া, যেখানে ৭৫০টি বাঘ রয়েছে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী ৪২৯টি বাঘ নিয়ে নেপাল এখন ইন্দোনেশিয়াকে (৪০০) ছাড়িয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বন্য বাঘের আবাসস্থল হিসেবে উঠে এসেছে।
সংরক্ষণে সাফল্য, সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
ডব্লিউডব্লিউএফ নেপালের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ঘনা শ্যাম গুরুং এই সাফল্যকে সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং সংরক্ষণ-সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে সংরক্ষণবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, নেপালের বনাঞ্চলে টেকসইভাবে সর্বোচ্চ প্রায় ৪০০টি বাঘ ধারণ করার সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমান সংখ্যা সেই সীমা অতিক্রম করায় মানুষ-বাঘ সংঘাত, আবাসস্থল বিভক্ত হওয়া এবং চোরাশিকারের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে নেপালে ১৬টি ‘সমস্যাপ্রবণ বাঘ’ বিশেষ ঘেরে রাখা হয়েছে। এসব বাঘের মধ্যে রয়েছে মানুষ আক্রমণের সঙ্গে জড়িত, আহত অথবা লোকালয় থেকে উদ্ধার করা প্রাণী। এগুলো চিতওয়ান, বারদিয়া, বানকে এবং জাওয়ালাখেলের সেন্ট্রাল চিড়িয়াখানায় রাখা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার চিতওয়ানের দেবনগরে ৫২ হেক্টর এলাকাজুড়ে একটি টাইগার স্যাংচুয়ারি গড়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সেখানে আহত ও মানুষ-বাঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়া বাঘ পুনর্বাসনের পাশাপাশি ইকো-ট্যুরিজমেরও সুযোগ তৈরি করা হবে।
ডব্লিউডব্লিউএফ নেপাল জানিয়েছে, ভবিষ্যতে স্থানীয় বন ব্যবস্থাপনা কমিটি, বাফার জোন কমিটি এবং স্থানীয় সরকারগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে মানুষ ও বাঘের সহাবস্থান নিশ্চিত করার উদ্যোগ জোরদার করা হবে। পাশাপাশি সম্প্রদায়ভিত্তিক নজরদারি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা, তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















