বিশ্ব অর্থনীতিতে আবারও একটি পুরোনো কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রশ্ন সামনে এসেছে—বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যহীনতা। ইতিহাস বলে, যখন একটি দেশ ধারাবাহিকভাবে অতিরিক্ত ঘাটতি বহন করে আর অন্যটি দীর্ঘদিন ধরে উদ্বৃত্ত জমায়, তখন সেই অসামঞ্জস্য শেষ পর্যন্ত শুধু বাণিজ্যিক বিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আর্থিক বাজারে ধাক্কা, মুদ্রার অস্থিরতা, পুঁজি প্রবাহে আকস্মিক পরিবর্তন, এমনকি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটও তার পরিণতি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের আগের সময়ের মতো তীব্র না হলেও উদ্বেগের কারণ যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের চলতি হিসাবের ঘাটতি আবার বাড়ছে, একই সময়ে চীনও উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্তে ফিরে এসেছে। কিন্তু এবার সমস্যাটি আরও জটিল, কারণ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার নতুন ঝুঁকি।
বাণিজ্য যুদ্ধ সমস্যার মূল নয়
বর্তমান বিতর্কে অনেকেই বাণিজ্য ঘাটতিকে মূল সমস্যা হিসেবে তুলে ধরছেন। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিকে শুল্ক আরোপের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করছে। ইউরোপও চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও সৌর প্যানেল শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
কিন্তু কেবল শুল্ক বাড়িয়ে বা আমদানি সীমিত করে এই সংকটের সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ দৃশ্যমান বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার পেছনে রয়েছে আরও গভীর অর্থনৈতিক কাঠামোগত কারণ। প্রকৃত সমস্যাটি হচ্ছে বিভিন্ন দেশের সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অসামঞ্জস্য।
অর্থাৎ বাণিজ্য হচ্ছে লক্ষণ; রোগটি আরও গভীরে।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিই তার দুর্বলতা
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির সমস্যাটি উৎপাদনের ঘাটতিতে নয়, বরং আর্থিক নীতিতে। বিশাল বাজেট ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের বিপুল পরিমাণ বিদেশি মূলধন আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে। এর প্রধান কারণ ডলারের বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব।
এই সুবিধা দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরে বহিঃখাতের ঘাটতি বহনের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ঝুঁকি। বিশ্বের বিপুল বিনিয়োগ এখন ডলারভিত্তিক সম্পদ এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে কেন্দ্রীভূত। সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে অতিরিক্ত বিনিয়োগ সেই কেন্দ্রীভবনকে আরও বাড়িয়েছে।
যদি কোনো কারণে মার্কিন আর্থিক বাজারে বড় ধরনের সংশোধন ঘটে, তাহলে তার অভিঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্বের আর্থিক বাজারও দ্রুত তার প্রভাব অনুভব করবে।
চীনের উদ্বৃত্তের ভিন্ন বাস্তবতা
অন্যদিকে চীনের উদ্বৃত্তের উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা সেই গতিতে বাড়ছে না। আবাসন খাতের দুর্বলতা, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে জনগণের অনিশ্চয়তা পরিবারগুলোকে বেশি সঞ্চয় করতে উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনও এই প্রবণতাকে শক্তিশালী করছে।

চীনের শিল্পনীতি অবশ্যই এই পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে, তবে সেটিই একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। প্রকৃত চিত্রটি আরও বিস্তৃত এবং দীর্ঘমেয়াদি।
তাই সমস্যার সমাধানও কেবল রপ্তানি সীমিত করা বা শুল্ক বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
দেশীয় সংস্কার ছাড়া উপায় নেই
বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতার সমাধান শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতির মধ্যেই নিহিত।
যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে বাজেট ঘাটতি কমাতে হবে এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা জোরদার করতে হবে। ঋণনির্ভর ভোগব্যয় অনির্দিষ্টকাল ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হতে পারে না।
একইভাবে চীনেরও অভ্যন্তরীণ ভোক্তা ব্যয় বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি, আর্থিক বাজারে ধীরে ধীরে আরও উন্মুক্ততা এবং উৎপাদনমুখী ভর্তুকির পরিবর্তে সেবা খাতের বিকাশ—এসব পদক্ষেপ দেশটির অর্থনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারে।
এই সংস্কার শুধু বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নয়; উভয় দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থেও জরুরি।
সমন্বয়হীন বিশ্ব আরও ঝুঁকিপূর্ণ
আজকের পৃথিবীতে কোনো বড় অর্থনীতি একা সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। একটি দেশের আর্থিক ধাক্কা মুহূর্তের মধ্যেই অন্য দেশের বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক মূলধন প্রবাহের আকস্মিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে।

এই কারণে আন্তর্জাতিক সমন্বয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস এবং ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সীমান্ত অতিক্রমকারী মূলধন প্রবাহ, আর্থিক ঝুঁকি এবং তারল্য পরিস্থিতির ওপর আরও কার্যকর নজরদারি গড়ে তুলতে হবে।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আশির দশকের প্লাজা অ্যাকর্ডের মতো বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সমঝোতা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু জি-৭ ও জি-২০ অন্তত তথ্যের স্বচ্ছতা, নীতিগত সংলাপ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংকটের প্রকৃতি বদলেছে
আজকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি শুধু আমদানি-রপ্তানির অঙ্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল ও কেন্দ্রীভূত বৈশ্বিক মূলধন প্রবাহ, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণনির্ভরতা, প্রযুক্তি খাতের অতিমূল্যায়ন এবং সার্বভৌম ঋণবাজারের ক্রমবর্ধমান চাপ।
ফলে কেবল বাণিজ্য ভারসাম্য কমানোই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই আর্থিক দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করা, যেগুলো ভবিষ্যতের বড় সংকটের ভিত্তি তৈরি করছে।
বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভুল রোগ নির্ণয় করলে সঠিক চিকিৎসাও সম্ভব হবে না। যদি বড় অর্থনীতিগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যাকে স্বীকার করে দায়িত্বশীল সংস্কারের পথে না হাঁটে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে আজকের অসমতা আগামী দিনের আরেকটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
লি জং-হোয়া 


















