পশ্চিমবঙ্গের ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানকে ঘিরে। ভোটের আগে নিজেই নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি পুনর্ভোটের দিন নিজের ভোটও দেননি। তারপরও নির্বাচন কমিশনের ফলাফলে দেখা গেছে, তিনি মোট ভোটের প্রায় ৩.৭ শতাংশ পেয়েছেন।
২৪ মে প্রকাশিত ফলাফলে বিজেপির দেবাংশু পান্ডা এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পান। তিনি মোট ভোটের ৭০ শতাংশের বেশি অর্জন করেন। সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও তার ভোট ২০ শতাংশের নিচে ছিল। কংগ্রেসের আবদুর রাজ্জাক মোল্লা পান প্রায় ৪.৮ শতাংশ ভোট। এর মধ্যেই আলোচনায় আসে জাহাঙ্গীর খানের ভোট পাওয়ার বিষয়টি।
কেন সরে দাঁড়িয়েছিলেন জাহাঙ্গীর
জাহাঙ্গীর খান ১৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, তিনি ২১ মের পুনর্ভোটে অংশ নেবেন না। তার দাবি ছিল, নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফলতার উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। সেই কারণেই তিনি রাজনৈতিক সংঘাত এড়িয়ে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ফলতার শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিজের এলাকাকে “সোনার ফলতা” হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তবে তৃণমূল কংগ্রেস পরে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, জাহাঙ্গীরের এই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। দলের পক্ষ থেকে তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
সহিংসতা ও পুনর্ভোটের পটভূমি
ফলতা কেন্দ্রটি শুরু থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ছিল। ২৯ এপ্রিলের মূল ভোটগ্রহণে ব্যাপক সহিংসতা, ভোটে অনিয়ম এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার অভিযোগ ওঠে। পরে নির্বাচন কমিশন পুরো কেন্দ্রের ২৮৫টি বুথেই পুনর্ভোটের নির্দেশ দেয়।
ভোটের দিন ইভিএমে অন্য প্রার্থীদের নাম কালো টেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এ নিয়ে জাহাঙ্গীর খানের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিযুক্ত পর্যবেক্ষক আইপিএস কর্মকর্তা অজয় পাল শর্মার প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডা হয়েছিল।
কীভাবে ভোট পেলেন তিনি
জাহাঙ্গীর খান নির্বাচনী লড়াই ছাড়ার ঘোষণা দিলেও আইনগতভাবে তিনি তখনও প্রার্থী ছিলেন। ভারতের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই কেবল কোনো প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারেন।
ফলতা কেন্দ্র যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেখানে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ১৩ এপ্রিল। কিন্তু জাহাঙ্গীর খান সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন ১৯ মে, অর্থাৎ নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার অনেক পরে। ফলে আইন অনুযায়ী তার নাম ও তৃণমূলের প্রতীক ইভিএম থেকে সরানো সম্ভব ছিল না।
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী পুনর্ভোটও আগের প্রার্থী তালিকা ও একই ইভিএম বিন্যাসে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ভোটারদের সামনে জাহাঙ্গীর খানের নাম ও প্রতীক আগের মতোই ছিল।
নির্বাচনী কর্মকর্তাদের মতে, অনেক তৃণমূল সমর্থক দলীয় প্রতীক দেখে ভোট দিয়েছেন। আবার কেউ হয়তো তার সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা সম্পর্কে জানতেন না। এছাড়া ডাকযোগে পাঠানো ভোটের একটি বড় অংশও আগে থেকেই জমা পড়েছিল। তার মোট প্রাপ্ত ভোটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এসেছে পোস্টাল ব্যালট থেকে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তৃণমূলের শক্তিশালী সংগঠক হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর খান দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মুখ ছিলেন। তাই ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও নির্বাচনী ব্যবস্থায় তার উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত থেকেই যায়।
ফলতা উপনির্বাচনে জাহাঙ্গীর খানের ভোট পাওয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার উত্তর মূলত নির্বাচনী আইনের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ফলতা উপনির্বাচন জাহাঙ্গীর খান ভোট বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গের ফলতা পুনর্ভোটে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েও জাহাঙ্গীর খানের ভোট পাওয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী আইনের কারণেই ইভিএমে ছিল তার নাম ও প্রতীক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















