ভারতের কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইউএপিএ-র অধীনে অভিযুক্তদের জামিন পাওয়া নিয়ে ফের বড় বিতর্ক শুরু হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। দীর্ঘদিন বিচার শেষ না হওয়া অবস্থায় অভিযুক্তদের জেলে আটকে রাখা কতটা সাংবিধানিক, তা নিয়ে শীর্ষ আদালতের বিভিন্ন রায়ে মতভেদ সামনে এসেছে। সেই কারণেই এবার বিষয়টি বড় বেঞ্চে পাঠানো হয়েছে।
সম্প্রতি দিল্লি দাঙ্গা মামলার দুই অভিযুক্ত আবদুল খালিদ সইফি ও তসলিম আহমদকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয় সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে আদালত জানায়, দীর্ঘ বিচারবিলম্ব কি ইউএপিএ-র কঠোর জামিনবিরোধী ধারা অতিক্রম করতে পারে কি না, তা বড় বেঞ্চে ঠিক করা হবে।
ইউএপিএ-তে জামিন এত কঠিন কেন
ইউএপিএ-র ৪৩ডি(৫) ধারাকে ভারতের সবচেয়ে কঠোর জামিনবিরোধী বিধানগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। এই ধারায় বলা হয়েছে, আদালত যদি প্রাথমিকভাবে মনে করে অভিযোগ সত্য হওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি আছে, তাহলে অভিযুক্ত জামিন পাবেন না।
২০১৯ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বিস্তারিত প্রমাণ বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। মামলার সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখেই আদালত জামিন নাকচ করতে পারে। ফলে সাধারণ ফৌজদারি আইনে যেখানে “জামিনই নিয়ম”, সেখানে ইউএপিএ-তে বাস্তবে “জেলই নিয়ম” হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘ কারাবাস নিয়ে আদালতের উদ্বেগ
২০২১ সালের কেএ নাজিব মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানায়, কোনও অভিযুক্তকে অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিচার ছাড়া জেলে আটকে রাখা যায় না। আদালত বলেছিল, বিচার প্রক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হলে সাংবিধানিক আদালত মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
এই রায়কে কেন্দ্র করেই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিচারপতি বি ভি নাগরত্না ও উজ্জ্বল ভূঁইয়ার বেঞ্চ সম্প্রতি মন্তব্য করে, ছোট বেঞ্চগুলোর কিছু রায় নাজিব মামলার মূল নীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশেষ করে উমর খালিদ ও শরজিল ইমামের জামিন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। উমর খালিদ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলে আছেন।
আর্টিকেল ২১ বনাম কঠোর আইন
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দ্রুত বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই শুধুমাত্র অভিযোগ গুরুতর বলেই কাউকে বছরের পর বছর বিচারহীন অবস্থায় আটকে রাখা যায় না।
বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া মন্তব্য করেন, রাষ্ট্র সময়মতো বিচার শেষ করতে ব্যর্থ হলে তার দায় অভিযুক্তের ওপর চাপানো যায় না। তিনি আরও বলেন, ইউএপিএ মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার খুবই কম, অথচ বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে জেলে থাকছেন।
বড় বেঞ্চে কী হতে পারে
এখন সুপ্রিম কোর্টের বড় বেঞ্চকে ঠিক করতে হবে, দীর্ঘ বিচারবিলম্ব এবং মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন কি ইউএপিএ-র কঠোর জামিনবিধির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে কি না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু দিল্লি দাঙ্গা মামলা নয়, ভবিষ্যতের বহু ইউএপিএ মামলার দিকও নির্ধারণ করবে। কারণ এই রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের কঠোরতা আর ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে আদালত কোন ভারসাম্য তৈরি করতে চায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















